দৈনিক সোজা সাপটা

তৃণমূল সামলানোই বড় পরীক্ষা



তৃণমূল সামলানোই বড় পরীক্ষা
তৃণমূল সামলানোই বড় পরীক্ষা

সোজাসাপটা রিপোর্ট

দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, মামলা-হামলা ও দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে সরকার গঠনের পর দলটির সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে সাংগঠনিক সংকট। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো এখন বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দলীয় কার্যক্রমেও। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।

গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি বিলুপ্তি, সাংগঠনিক পরিবর্তন ও বহিষ্কারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কমিটিতে পরিবর্তন দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

দলীয় কাঠামোর মূল ভিত্তি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা এবং জেলা পর্যায়ের কমিটি। এসব কমিটির মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দলের যোগাযোগ বজায় থাকে, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় এবং নতুন নেতৃত্ব উঠে আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ।

বিএনপি দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে সাংগঠনিক পুনর্গঠন না চলায় নেতৃত্বের একটি অংশের প্রভাব বেড়েছে। এতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের সামনে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের অনেকে।

মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটিগুলো পুনর্গঠন নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশা থাকলেও অনেক জেলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। কোথাও পুরোনো কমিটি কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়, আবার কোথাও নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো নেতৃত্বের একটি অংশ নতুন কমিটিতেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে দীর্ঘদিন দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে যুবদল ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়। তবে এসব কমিটির পরবর্তী কাঠামো কী হবে, নতুন নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচন করা হবে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কারা অগ্রাধিকার পাবেন—এসব প্রশ্ন এখনো নেতা-কর্মীদের আলোচনায় রয়েছে।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, মামলা ও হামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের প্রত্যাশা এখন দলের নেতৃত্ব ও নির্বাচনী কার্যক্রমে মূল্যায়ন পাওয়া। তৃণমূলের একাংশ মনে করছে, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতা-কর্মীদের সামনে আনার সময় এসেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে এখন সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় এবং জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

যশোরের এক তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিরোধী দলে থাকার সময় আমরা পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছি। এখন দল ক্ষমতায় আসার পর দেখছি, যারা এত দিন নিষ্ক্রিয় ছিল বা বিদেশে আরাম-আয়েশে ছিল, তারা এসে পদে বসার জন্য কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ করছে।”

সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। দল ক্ষমতায় থাকায় স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া অনেকের কাছে বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে একই এলাকায় একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

মনোনয়নকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা কিছু জায়গায় ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নিচ্ছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, কুৎসা এবং সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে আসছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সমন্বয়ের চেষ্টা থাকলেও সব এলাকায় তা কার্যকর হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ মানদণ্ড না থাকার অভিযোগও রয়েছে।

মনোনয়ন নিয়ে এই প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থী নির্বাচনে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা এবং গ্রহণযোগ্যতা কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব দলের ভাবমূর্তিতে পড়ে। বিএনপির ক্ষেত্রেও এসব অভিযোগ মোকাবিলা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বহিষ্কার বা কমিটি বিলুপ্তির মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একই ধরনের ঘটনায় সব নেতা-কর্মীর ক্ষেত্রে সমান নিয়ম প্রয়োগ করা জরুরি।

কোনো নেতা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখোমুখি হলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় গ্রুপিং কিংবা প্রতিপক্ষের অভিযোগের কারণে কেউ যেন অন্যায়ভাবে শাস্তির মুখে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

বিএনপির সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনা ও দল পরিচালনার মধ্যে সমন্বয় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দলের শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতাদের অনেকেই মন্ত্রিসভা, সংসদ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে যুক্ত। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কাজে তাদের সময় দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততার কারণে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সহজে পৌঁছাতে না পারা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে দ্রুত সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন মাঠপর্যায়ের অনেকে।

এই পরিস্থিতিতে দলীয় কার্যালয়গুলোতে নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালু রাখা, কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার ও দলের কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না হলে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “বিএনপির সামনে এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন, স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়ানো এবং সরকারের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা—এই কাজগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রের নির্দেশনা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যকার এই যোজন যোজন দূরত্ব ঘোচানোই এখন বিএনপির প্রধান কাজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হতে পারে।”

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার প্রমাণ ইতোমধ্যে দেশবাসী দেখেছে। যত বড় নেতাই হোন না কেন, অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।”

তিনি বলেন, “দল ক্ষমতায় থাকলে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়িয়ে দলটিকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। আশা করি, বিএনপি সময়ের ব্যবধানে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে।”

দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, নেতৃত্বের বিকাশ, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নগুলো এখন বিএনপির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় কাঠামো সচল রাখা এবং তৃণমূলের প্রত্যাশার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সমন্বয় করতে পারলেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক সোজা সাপটা

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


তৃণমূল সামলানোই বড় পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সোজাসাপটা রিপোর্ট

দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, মামলা-হামলা ও দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে সরকার গঠনের পর দলটির সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে সাংগঠনিক সংকট। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো এখন বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দলীয় কার্যক্রমেও। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।

গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি বিলুপ্তি, সাংগঠনিক পরিবর্তন ও বহিষ্কারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কমিটিতে পরিবর্তন দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

দলীয় কাঠামোর মূল ভিত্তি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা এবং জেলা পর্যায়ের কমিটি। এসব কমিটির মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দলের যোগাযোগ বজায় থাকে, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় এবং নতুন নেতৃত্ব উঠে আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ।

বিএনপি দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে সাংগঠনিক পুনর্গঠন না চলায় নেতৃত্বের একটি অংশের প্রভাব বেড়েছে। এতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের সামনে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের অনেকে।

মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটিগুলো পুনর্গঠন নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশা থাকলেও অনেক জেলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। কোথাও পুরোনো কমিটি কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়, আবার কোথাও নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো নেতৃত্বের একটি অংশ নতুন কমিটিতেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে দীর্ঘদিন দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে যুবদল ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়। তবে এসব কমিটির পরবর্তী কাঠামো কী হবে, নতুন নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচন করা হবে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কারা অগ্রাধিকার পাবেন—এসব প্রশ্ন এখনো নেতা-কর্মীদের আলোচনায় রয়েছে।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, মামলা ও হামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের প্রত্যাশা এখন দলের নেতৃত্ব ও নির্বাচনী কার্যক্রমে মূল্যায়ন পাওয়া। তৃণমূলের একাংশ মনে করছে, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতা-কর্মীদের সামনে আনার সময় এসেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে এখন সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় এবং জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

যশোরের এক তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিরোধী দলে থাকার সময় আমরা পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছি। এখন দল ক্ষমতায় আসার পর দেখছি, যারা এত দিন নিষ্ক্রিয় ছিল বা বিদেশে আরাম-আয়েশে ছিল, তারা এসে পদে বসার জন্য কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ করছে।”

সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। দল ক্ষমতায় থাকায় স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া অনেকের কাছে বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে একই এলাকায় একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

মনোনয়নকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা কিছু জায়গায় ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নিচ্ছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, কুৎসা এবং সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে আসছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সমন্বয়ের চেষ্টা থাকলেও সব এলাকায় তা কার্যকর হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ মানদণ্ড না থাকার অভিযোগও রয়েছে।

মনোনয়ন নিয়ে এই প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রার্থী নির্বাচনে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা, জনসম্পৃক্ততা এবং গ্রহণযোগ্যতা কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব দলের ভাবমূর্তিতে পড়ে। বিএনপির ক্ষেত্রেও এসব অভিযোগ মোকাবিলা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বহিষ্কার বা কমিটি বিলুপ্তির মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একই ধরনের ঘটনায় সব নেতা-কর্মীর ক্ষেত্রে সমান নিয়ম প্রয়োগ করা জরুরি।

কোনো নেতা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখোমুখি হলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় গ্রুপিং কিংবা প্রতিপক্ষের অভিযোগের কারণে কেউ যেন অন্যায়ভাবে শাস্তির মুখে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

বিএনপির সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনা ও দল পরিচালনার মধ্যে সমন্বয় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দলের শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতাদের অনেকেই মন্ত্রিসভা, সংসদ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে যুক্ত। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কাজে তাদের সময় দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততার কারণে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সহজে পৌঁছাতে না পারা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে দ্রুত সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন মাঠপর্যায়ের অনেকে।

এই পরিস্থিতিতে দলীয় কার্যালয়গুলোতে নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালু রাখা, কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার ও দলের কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না হলে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “বিএনপির সামনে এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন, স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়ানো এবং সরকারের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা—এই কাজগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”

তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রের নির্দেশনা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যকার এই যোজন যোজন দূরত্ব ঘোচানোই এখন বিএনপির প্রধান কাজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হতে পারে।”

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার প্রমাণ ইতোমধ্যে দেশবাসী দেখেছে। যত বড় নেতাই হোন না কেন, অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।”

তিনি বলেন, “দল ক্ষমতায় থাকলে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়িয়ে দলটিকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। আশা করি, বিএনপি সময়ের ব্যবধানে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে।”

দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, নেতৃত্বের বিকাশ, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নগুলো এখন বিএনপির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় কাঠামো সচল রাখা এবং তৃণমূলের প্রত্যাশার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সমন্বয় করতে পারলেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।



দৈনিক সোজা সাপটা

সম্পাদক :
আবু সাউদ মাসুদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
তৃণমূল সামলানোই বড় পরীক্ষা
0:00 / 0:00
1x