নারায়ণগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর আহতদের চিকিৎসা ও পাশে দাঁড়ানো নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা গেছে। ছাত্রশিবিরের আহত নেতাকর্মীদের পাশে জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা নিয়মিত অবস্থান করলেও ছাত্রদলের আহতদের পাশে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। এতে ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া ও কলেজ রোড এলাকায় সরকারি তোলারাম কলেজকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় দুই সংগঠনের অন্তত সাতজন নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল হক শুভ, সাধারণ সম্পাদক তামিম, অর্থ সম্পাদক জুবায়েদ, মনির ও ইসমাইল রয়েছেন। ছাত্রদলের নেতা তুহিন আহমেদসহ আরও দুজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
সংঘর্ষের পর দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের নেতাকর্মীদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতারা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করতে শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
ঘটনার পর আহত ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের চিকিৎসার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের কয়েকজনকে ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জেলা ও মহানগর জামায়াতে ইসলামীর নেতারা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার বিভিন্ন বিষয়েও সহযোগিতা করছেন।
শুধু স্থানীয় নেতারাই নন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও আহত ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের দেখতে হাসপাতালে যান। তিনি তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং চিকিৎসার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের এ তৎপরতা আহত শিবির নেতাকর্মীদের প্রতি সংগঠনটির সাংগঠনিক সহায়তার বিষয়টি সামনে এনেছে।
অন্যদিকে ছাত্রদলের আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন সংগঠনটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। তারা নারায়ণগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে আহত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দেখতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের হাসপাতালে না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কাউকে আহতদের পাশে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এমনকি নারায়ণগঞ্জের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও কেউ হাসপাতালে গিয়ে আহত ছাত্রদল নেতাদের পাশে দাঁড়াননি বলে তাদের অভিযোগ।
তবে এই অবস্থার মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে মহানগর বিএনপির নেতা জাকির খান আহত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দেখতে হাসপাতালে যান। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেন, শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পর সংগঠনের কর্মীরা যখন হামলায় আহত হয়েছেন, তখন তাদের চিকিৎসা ও খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি হতাশাজনক। তাদের প্রশ্ন, দলের কঠিন সময়ে যারা মাঠে থাকেন, আহত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার?
তাদের মতে, রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদের কাছে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সংকটের সময়। একজন কর্মী আহত হওয়ার পর তার চিকিৎসা, পরিবারের খোঁজখবর এবং মানসিকভাবে পাশে দাঁড়ানোও সাংগঠনিক দায়িত্বের অংশ। সেই জায়গায় ছাত্রশিবিরের আহতদের পাশে জামায়াতের নেতাদের সক্রিয়তা এবং ছাত্রদলের আহতদের ক্ষেত্রে বিএনপির নেতাদের অনুপস্থিতি নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর তোলারাম কলেজ ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংঘর্ষের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পর্ক, সাংগঠনিক দায়িত্ববোধ এবং দলীয় কর্মীদের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
একদিকে জামায়াতের আমির থেকে শুরু করে জেলা-মহানগরের নেতারা আহত শিবির কর্মীদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন, অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির অভিযোগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে সংঘর্ষের ঘটনাটি শুধু দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আপনার মতামত লিখুন :