নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে শীর্ষ নেতাদের বলয়ভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নিজেদের অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে বিভিন্ন পক্ষের টানাপোড়েনের কারণেই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া বারবার থমকে যাচ্ছে বলে দাবি মাঠ পর্যায়ের নেতাদের।
দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়েছে। নেতৃত্বের অভাবে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, নতুন কর্মী তৈরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমন্বিত অংশগ্রহণ—সবকিছুতেই এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের।
তাদের ভাষ্য, একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বর্তমানে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কার্যকর কমিটি না থাকায় সেই সাংগঠনিক সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত কমিটি ঘোষণা না হলে সংগঠনটির তৃণমূল আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণ দেখিয়ে জেলা ও মহানগরের পাশাপাশি থানা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি এবং মহানগর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে মেয়াদ শেষ হওয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত গতি না আসায় কেন্দ্র থেকে কমিটিগুলো বিলুপ্ত করা হয়।
তবে এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে জেলা ও মহানগর ছাত্রদল কার্যত পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বের বাইরে রয়েছে। এতে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের বিভিন্ন বলয়ের চাপ কাজ করছে। জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের প্রত্যেকে নিজেদের অনুসারী ও ঘনিষ্ঠদের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চান। এ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে বলে তাদের দাবি।
তবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে এমন বলয়ভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের কথা স্বীকার করেননি। ফলে অভিযোগটির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
ছাত্রদলের মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও আন্দোলনে ভূমিকার পরিবর্তে যদি ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে।
তাদের প্রশ্ন, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে ছিলেন, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের সঙ্গে থেকেছেন, নতুন কমিটি গঠনের সময় তাদের মূল্যায়ন কতটা হচ্ছে?
জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কার্যকর কমিটি না থাকায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে দাবি নেতাকর্মীদের। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ থাকলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে। নিয়মিত সাংগঠনিক সভা, কর্মী সমাবেশ, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করার কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কমিটি থাকলে দায়িত্ব ও জবাবদিহির একটি কাঠামো থাকে। কে কোন এলাকায় কাজ করবেন, কার কাছে সাংগঠনিক নির্দেশনা নেওয়া হবে কিংবা নতুন কর্মীদের কীভাবে সংগঠিত করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকে। কিন্তু কমিটি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সেই সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে কর্মীদের মধ্যেও। দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক নেতাকর্মী হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন তৃণমূলের কয়েকজন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন মূল প্রত্যাশা দ্রুত জেলা ও মহানগর কমিটি ঘোষণা। তাদের মতে, কমিটি ঘোষণার পর নতুন করে থানা, ওয়ার্ড, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতারা অবশ্য বলছেন, নারায়ণগঞ্জকে তারা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক এলাকা হিসেবে দেখছেন। নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ত্যাগ, যোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্যদের সমন্বয়ে কমিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের ছাত্রদলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা এখন কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকেরই প্রশ্ন—কমিটি গঠনের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
তাদের মতে, বিএনপি যখন রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন ছাত্রদলের মতো সহযোগী সংগঠনের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নেতৃত্বশূন্যতা দীর্ঘায়িত হওয়া ভবিষ্যতের জন্য ভালো সংকেত নয়।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হলে এর প্রভাব মূল দলের রাজনীতিতেও পড়তে পারে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে পুরোনো নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে সংগঠনকে মাঠে ফেরানো এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
তাদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত বলয় কিংবা পদ-পদবির হিসাবের বাইরে গিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে। তা না হলে কমিটি ঘোষণার পরও সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটবে না বলে আশঙ্কা তাদের।

আপনার মতামত লিখুন :