ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর আজ

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর আজ

আজ থেকে দুই বছর আগে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান আর সরকার পতনের খবরে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল থেকে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও আতঙ্কে থাকা শহর দুপুরের পর বদলে যায় পুরোপুরি। বিকেল গড়ানোর আগেই চাষাঢ়া পরিণত হয় মানুষের মিলনস্থলে। রাত পর্যন্ত চলে বিজয় মিছিল, স্লোগান ও উল্লাস।
ঘটনাবহুল ওই দিনের সকাল শুরু হয়েছিল অনেকটা থমথমে পরিবেশে। আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে চাষাঢ়া ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শহরের রূপায়ণ টাওয়ারে অয়ন ওসমানের কার্যালয়েও সকাল থেকেই ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা যায়।
অন্যদিকে ঢাকামুখী লংমার্চে অংশ নিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীরা শহরের দিকে আসতে থাকেন। একপর্যায়ে চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে চাষাঢ়া গোলচত্বর ও আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে চাষাঢ়া গোলচত্বরের বিভিন্ন দিক থেকে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সকাল ১১টার দিকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। এতে পুরো চাষাঢ়া এলাকা রণক্ষেত্রের রূপ নেয়।
ওই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন যুবদল নেতা স্বজন। একই দিন ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পথে প্রাণ হারান সাবেক ছাত্রদল নেতা আমানত। এ ছাড়া দিনভর সংঘর্ষ ও সহিংসতায় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে দুপুরের পর পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসতে শুরু করে। দুপুরের আগেই চাষাঢ়া এলাকা থেকে পুলিশ সরে যায়। পরে আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধের মুখে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরাও ধীরে ধীরে এলাকা ছাড়তে শুরু করেন।
এর মধ্যে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে শহরের পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ চাষাঢ়ার দিকে আসতে শুরু করেন। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে রাজপথে।
দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কার্যত পাল্টে যায়। তখনও চাষাঢ়া ও আশপাশের কিছু এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান ছিল। তবে সরকার পতনের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তারাও দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকেন।
এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার পতনের ঘোষণা আসার আগেই চাষাঢ়া এলাকায় মানুষের ঢল নামে। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও রাজপথে নেমে আসেন।
দুপুরের আতঙ্ক আর সংঘর্ষের চিত্র বদলে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই চাষাঢ়া হয়ে ওঠে বিজয় উদযাপনের কেন্দ্র। বিভিন্ন সড়কে মানুষকে মিছিল করতে দেখা যায়। স্লোগান, জাতীয় পতাকা ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়কগুলো।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজপথে চলে বিজয় মিছিল। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ দলে দলে চাষাঢ়ায় এসে জড়ো হন। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষকেও এ উল্লাসে অংশ নিতে দেখা যায়।
দিনটির শুরুতে যেখানে ছিল সংঘর্ষ, গুলির শব্দ ও আতঙ্ক, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই একই রাজপথে দেখা যায় উল্টো চিত্র—মানুষের ঢল, জাতীয় পতাকা আর বিজয় উদযাপন।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট তাই একদিকে যেমন রক্তাক্ত ও সংঘাতময় একটি দিন, অন্যদিকে সরকার পতনের পর রাজপথে মানুষের অভূতপূর্ব উল্লাসেরও সাক্ষী হয়ে আছে। স্থানীয়দের অনেকের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর এমন ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত বিজয় উদযাপনের দৃশ্য নারায়ণগঞ্জের রাজপথে আগে দেখা যায়নি।

Link copied!