বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হবে। এর আগে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করে কয়েকজনকে সরিয়ে নতুন মুখ যুক্ত করা এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সূত্র বলছে, দায়িত্ব পালনের দক্ষতা, মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি, জনসম্পৃক্ততা, প্রশাসন পরিচালনায় সক্ষমতা এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সময় যারা বিতর্কে জড়িয়েছেন কিংবা প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি, তাদের বিষয়েও আলাদা করে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। তাদের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য পরিবর্তনের মধ্যে কয়েকজনকে বাদ দেওয়া, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্বে রদবদলের বিষয় রয়েছে।
সরকারের ভেতরের আলোচনায় মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। টেকনোক্রেট হিসেবে কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উপদেষ্টা ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ সংসদ সদস্যদেরও মন্ত্রিসভায় আনার চিন্তা রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকার পদে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না এলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও সেলিমা রহমান মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে দলীয় ও রাজনৈতিক মহলে।
নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং রকিবুল ইসলাম বকুলের নাম বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে।
শুধু বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আলোচনা। সরকারের শরিক ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের নামও আলোচনায় রয়েছে।
মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের অন্যতম কারণ হিসেবে একাধিক মন্ত্রণালয়ে একই ব্যক্তির অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১২ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এতে কোথাও কোথাও কাজের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে সরকারের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। ফলে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি রদবদলের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মন্ত্রীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নয়, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে তাদের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, মাঠ প্রশাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবে পদক্ষেপ এবং জাতীয় সংসদে সক্রিয় ভূমিকার মতো বিষয়ও পর্যালোচনায় রাখা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কয়েকজন মন্ত্রীকে চাপের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে কয়েকজন প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাশার তুলনায় ভালো কাজ করছেন। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন সংসদ সদস্যকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং সরকারের সামগ্রিক প্রয়োজন বিবেচনা করেই মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :