সোজাসাপটা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে মেট্রোরেল প্রকল্পকে ঘিরে। ঢাকার গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যাওয়ার প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২-এর রুট নিয়ে পরিবর্তনের আলোচনা শুরু থেকেই শহরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, প্রকল্পের আগের পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও পরবর্তী পরিকল্পনায় রূপগঞ্জের তারাবোকে গন্তব্য করার উদ্যোগ সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত না করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উন্নয়নের প্রশ্নে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন শহরের দায়িত্বে থাকা তিন নেতা—কালাম, সাখাওয়াত ও রাজীব। বিপরীতে, তারাবোকে কেন্দ্র করে মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে গেলে সেটিকে দীপু ভূইয়ার রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এমআরটি লাইন-২ নিয়ে সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জের দিকে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) প্রকাশিত পুরোনো রুট পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর, ঝিগাতলা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, আজিমপুর, পলাশী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, গুলিস্তান, মতিঝিল, কমলাপুর, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও, দামড়িপাড়া, সাইনবোর্ড, ভূইঘর ও জালকুড়ি হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরে যাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে নয়া বাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইনের প্রস্তাবও ছিল। অর্থাৎ, প্রাথমিক পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ শহরের সঙ্গে মেট্রোরেল যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে রুট পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশোধিত পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে ডেমরা পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারাবো পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও সামনে আসে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারাবোকে সম্ভাব্য শেষ গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ফলে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু যাতায়াতের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন এবং প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে হয়। চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, কালীরবাজার, নিতাইগঞ্জ ও খানপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নাগরিক কার্যক্রমের ব্যাপক চাপ রয়েছে। এসব এলাকার সঙ্গে দ্রুত গণপরিবহনের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে নাগরিকদের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি যানজট নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, রূপগঞ্জের তারাবোও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও আবাসনকেন্দ্র। সেখানে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তারাবোকে যুক্ত করার নামে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি গণপরিবহনের এই বড় প্রকল্পের বাইরে রাখা হলে তা শহরবাসীর কাছে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই দাবি উঠেছে, তারাবো পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়া হোক, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরকে বঞ্চিত করে নয়। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের রুট, সংযোগব্যবস্থা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে শহরের মানুষও সরাসরি সুবিধা পান।
এখানে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়ন ও নাগরিক স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা কালাম, সাখাওয়াত ও রাজীবের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মেট্রোরেলের রুট নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, ডিএমটিসিএল ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শহরকে প্রকল্পের আওতায় আনার যৌক্তিকতা তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি শহরের জনসংখ্যা, শিল্প-বাণিজ্যের গুরুত্ব, দৈনিক যাত্রীসংখ্যা এবং যানজটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে একটি শক্তিশালী দাবি উপস্থাপন করা যেতে পারে।
কারণ, মেট্রোরেল কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে। যে এলাকার সঙ্গে দ্রুত গণপরিবহনের সংযোগ তৈরি হবে, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। সে বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাদ দিয়ে শুধু তারাবো পর্যন্ত প্রকল্প সীমিত থাকলে শহরবাসীর একটি বড় অংশ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এ অবস্থায় দীপু ভূইয়ার সঙ্গে কালাম-সাখাওয়াত-রাজীবের রাজনৈতিক তুলনাও সামনে আসতে পারে। তারাবোকে ঘিরে মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে গেলে স্থানীয় রাজনীতিতে সেটিকে উন্নয়ন অর্জন হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। বিপরীতে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নেতারা যদি শহরের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সেই ব্যর্থতাকে সামনে আনতে পারে। তবে এ বিষয়ে কারও ব্যক্তিগত ভূমিকা বা কৃতিত্ব নির্ধারণের আগে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাস্তব ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২-এর দৈর্ঘ্য, স্টেশনসংখ্যা ও ব্যয়ের হিসাবেও বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন দেখা গেছে। ডিএমটিসিএলের প্রকাশিত তথ্যে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬০ হাজার ৮৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সংবাদ প্রতিবেদনে প্রায় ২৪টি স্টেশন, উড়াল ও পাতাল রেলপথের সমন্বয় এবং বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ সহায়তা চাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্যমাত্রার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব বিষয় চূড়ান্ত নকশা, অনুমোদন ও অর্থায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল।
এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জ শহরের জন্য মেট্রোরেল সংযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নেতারা কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেন। শহরবাসীর দাবি হওয়া উচিত—তারাবো পর্যন্ত মেট্রোরেল যাক, তাতে আপত্তি নেই; কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাদ দিয়ে নয়। শহরের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশ এবং নাগরিক যাতায়াতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের রুট ও সংযোগব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্প নারায়ণগঞ্জ শহরকে কতটা সুবিধা দেবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর। এখনই উদ্যোগ নেওয়ার সময়। কালাম-সাখাওয়াত-রাজীব যদি শহরের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে তাঁরা নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। আর যদি শহরকে যুক্ত করার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে যায়, তাহলে উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার দায় নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
সোজাসাপটা রিপোর্ট
নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে মেট্রোরেল প্রকল্পকে ঘিরে। ঢাকার গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যাওয়ার প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২-এর রুট নিয়ে পরিবর্তনের আলোচনা শুরু থেকেই শহরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, প্রকল্পের আগের পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও পরবর্তী পরিকল্পনায় রূপগঞ্জের তারাবোকে গন্তব্য করার উদ্যোগ সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত না করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উন্নয়নের প্রশ্নে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন শহরের দায়িত্বে থাকা তিন নেতা—কালাম, সাখাওয়াত ও রাজীব। বিপরীতে, তারাবোকে কেন্দ্র করে মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে গেলে সেটিকে দীপু ভূইয়ার রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এমআরটি লাইন-২ নিয়ে সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জের দিকে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) প্রকাশিত পুরোনো রুট পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর, ঝিগাতলা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, আজিমপুর, পলাশী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, গুলিস্তান, মতিঝিল, কমলাপুর, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও, দামড়িপাড়া, সাইনবোর্ড, ভূইঘর ও জালকুড়ি হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরে যাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে নয়া বাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইনের প্রস্তাবও ছিল। অর্থাৎ, প্রাথমিক পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ শহরের সঙ্গে মেট্রোরেল যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে রুট পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশোধিত পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে ডেমরা পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারাবো পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও সামনে আসে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারাবোকে সম্ভাব্য শেষ গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ফলে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু যাতায়াতের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন এবং প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে হয়। চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, কালীরবাজার, নিতাইগঞ্জ ও খানপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নাগরিক কার্যক্রমের ব্যাপক চাপ রয়েছে। এসব এলাকার সঙ্গে দ্রুত গণপরিবহনের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে নাগরিকদের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি যানজট নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, রূপগঞ্জের তারাবোও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও আবাসনকেন্দ্র। সেখানে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তারাবোকে যুক্ত করার নামে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সরাসরি গণপরিবহনের এই বড় প্রকল্পের বাইরে রাখা হলে তা শহরবাসীর কাছে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই দাবি উঠেছে, তারাবো পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়া হোক, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরকে বঞ্চিত করে নয়। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের রুট, সংযোগব্যবস্থা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে শহরের মানুষও সরাসরি সুবিধা পান।
এখানে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়ন ও নাগরিক স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা কালাম, সাখাওয়াত ও রাজীবের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মেট্রোরেলের রুট নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, ডিএমটিসিএল ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শহরকে প্রকল্পের আওতায় আনার যৌক্তিকতা তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি শহরের জনসংখ্যা, শিল্প-বাণিজ্যের গুরুত্ব, দৈনিক যাত্রীসংখ্যা এবং যানজটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে একটি শক্তিশালী দাবি উপস্থাপন করা যেতে পারে।
কারণ, মেট্রোরেল কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে। যে এলাকার সঙ্গে দ্রুত গণপরিবহনের সংযোগ তৈরি হবে, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। সে বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাদ দিয়ে শুধু তারাবো পর্যন্ত প্রকল্প সীমিত থাকলে শহরবাসীর একটি বড় অংশ প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এ অবস্থায় দীপু ভূইয়ার সঙ্গে কালাম-সাখাওয়াত-রাজীবের রাজনৈতিক তুলনাও সামনে আসতে পারে। তারাবোকে ঘিরে মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে গেলে স্থানীয় রাজনীতিতে সেটিকে উন্নয়ন অর্জন হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। বিপরীতে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নেতারা যদি শহরের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সেই ব্যর্থতাকে সামনে আনতে পারে। তবে এ বিষয়ে কারও ব্যক্তিগত ভূমিকা বা কৃতিত্ব নির্ধারণের আগে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাস্তব ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২-এর দৈর্ঘ্য, স্টেশনসংখ্যা ও ব্যয়ের হিসাবেও বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন দেখা গেছে। ডিএমটিসিএলের প্রকাশিত তথ্যে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬০ হাজার ৮৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সংবাদ প্রতিবেদনে প্রায় ২৪টি স্টেশন, উড়াল ও পাতাল রেলপথের সমন্বয় এবং বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ সহায়তা চাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্যমাত্রার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব বিষয় চূড়ান্ত নকশা, অনুমোদন ও অর্থায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল।
এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জ শহরের জন্য মেট্রোরেল সংযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নেতারা কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেন। শহরবাসীর দাবি হওয়া উচিত—তারাবো পর্যন্ত মেট্রোরেল যাক, তাতে আপত্তি নেই; কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাদ দিয়ে নয়। শহরের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশ এবং নাগরিক যাতায়াতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের রুট ও সংযোগব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্প নারায়ণগঞ্জ শহরকে কতটা সুবিধা দেবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর। এখনই উদ্যোগ নেওয়ার সময়। কালাম-সাখাওয়াত-রাজীব যদি শহরের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে তাঁরা নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। আর যদি শহরকে যুক্ত করার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে যায়, তাহলে উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার দায় নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

Safari-র নিচের Share (⬆) বাটনে চাপুন, তারপর "Add to Home Screen" বেছে নিন।
আপনার মতামত লিখুন