সিদ্ধিরগঞ্জে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষিত পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপোতে কর্মচারীদের কাছে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে বহুল আলোচিত মহানগর কৃষক দলের নেতা আ’লীগের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠা সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সাল (ফয়সাল মোল্লা)-কে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে ডিবির একটি দল বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে, চাঁদাবাজি ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ডিবির হাতে গ্রেপ্তারের পর পরই সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে তার সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ না রাখার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মো. হাছিনুজ্জামান জানান, চাঁদাবাজির সুস্পষ্ট অভিযোগে ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে কর্মরত চেকার মো. রফিকুল ইসলামকে গত ১ জুলাই সকালে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন ফয়সাল। ফোনে তিনি ডিপোর সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছ থেকে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। রফিকুল ইসলাম চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফয়সাল তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ খুন-জখমের হুমকি দেন। এরপরও বিভিন্ন সময়ে ফোন করে একইভাবে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত রাখা হয়।
পরবর্তীতে গত ১ আগস্ট সকাল সোয়া ১১টার দিকে ফয়সাল তার অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন সহযোগীকে নিয়ে গোদনাইল ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে বেআইনিভাবে প্রবেশ করেন। সেখানে উপস্থিত কর্মীদের কাছে আবারও একই অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। কর্মীরা চাঁদা দিতে রাজি না হলে আসামিরা চরম মারমুখী আচরণ করেন। একই সঙ্গে চাঁদা না দিলে ডিপোতে চাকরি করতে দেওয়া হবে না এবং বিষয়টি নিয়ে থানা বা আদালতে অভিযোগ করলে কর্মীদের হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন ফয়সাল ও তার বাহিনী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১ আগস্ট বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে বিএনপি নেতা ওকিল উদ্দিন ভুঁইয়ার ভাতিজা সজীব ভুঁইয়া এবং ভাগনে ফয়সাল মোল্লাসহ ১৫ থেকে ২০ জন ব্যক্তির একটি দল ডিপোতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের এই দলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু চিহ্নিত ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের মধ্যে আমির, গোলাম, পঞ্চবটির শ্রমিক লীগ নেতা পলাশের অনুসারী কয়েকজন এবং যুবলীগের আল-আমিন ভূঁইয়া উপস্থিত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
ডিপোতে প্রবেশ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি ও হুমকিমূলক আচরণ করা হয়। এ সময় ফয়সাল মোল্লা চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে উচ্চস্বরে বলেন, ”ডিপো আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো, এখানে প্রশাসন তথা ডিসি-এসপিরও গনার সময় নেই। এখানে স্বয়ং তারেক রহমান আসলেও আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে।” তার এমন হুঙ্কার ও হুমকির পর কেপিআই এলাকাটিতে কর্মরত কর্মচারী এবং তেল সরবরাহকারী ট্যাংকলরি পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
ফয়সালের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই এলাকায় চরম দখলবাজি ও চাঁদাবাজি শুরু করেন ফয়সাল।
এলাকার মানুষের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের সাথে লিয়াজোঁ করে চললেও সরকার পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই বিএনপির বড় নেতা সেজে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এর আগে গত মার্চ মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ড্রেজার ব্যবসা থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগে ফয়সাল ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তাছাড়া, গত ১ আগস্ট পদ্মা অয়েলের এটিএফ (এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল) ডেলিভারি পয়েন্টে কর্মী পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নবনিযুক্ত কর্মীদের অবিলম্বে কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয় এই ফয়সাল বাহিনী।
এদিকে গ্রেফতারের পর ফয়সালের এসব অপকর্মের তথ্য-প্রমাণ ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমলে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল কেন্দ্রীয় সংসদ কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালকে বহিস্কার করা হয়েছে। কৃষক দল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।
এদিকে এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা ফয়সাল মোল্লার গ্রেপ্তারে স্বস্তি প্রকাশ করে তার কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :