ঢাকা সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬

ছয় মাসে ৩৮ নেতাকর্মী নিহত

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬

ছয় মাসে ৩৮ নেতাকর্মী নিহত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত ছয় মাসে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ নেতাকর্মী পৃথক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় বিরোধ, পুরোনো শত্রুতা এবং চাঁদাবাজি, দখল ও বিভিন্ন অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
একই সময়ে সামগ্রিকভাবে দেশের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত ৩৮ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন। এছাড়া যুবদলের ৮, ছাত্রদলের ২, শ্রমিক দলের ২, কৃষক দলের ২, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ এবং তাঁতীদলের একজন রয়েছেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। এ ঘটনায় যুবদলের আরেক কর্মী এবং একজন সবজি বিক্রেতাও আহত হন।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ভাড়াটে অস্ত্রধারীদের ঢাকায় আনা হয়েছিল। তবে হামলার সময় গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পারভেজ নিহত হন বলে পুলিশের ভাষ্য। তদন্তকারীদের মতে, ময়লা ব্যবস্থাপনার ঠিকাদারি, ফুটপাতের ব্যবসা, অন্যান্য ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং টিনশেড ঘরের দখল নিয়ে বিরোধ থেকেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়। এ ঘটনায় ভাড়াটে শ্যুটারসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে কাফরুল থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
এর কয়েক দিন আগে, ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। পূর্ববিরোধের জেরে যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীসহ ১০ থেকে ১৫ জন এই হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির স্থগিত সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে বিরোধের জেরে ভাড়াটে অপরাধীদের ব্যবহার করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
এর আগে ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ এ হত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের সহিংসতায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিএনপির কর্মী রাজু আহম্মেদ, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী, খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহে বিএনপিকর্মী রানা মিয়া এবং বাগেরহাটে কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়ল পৃথক ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশে অন্তত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত হন ৩৬ জন এবং আহত হন ৪ হাজার ৭৮ জন।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬১০টি ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকেন্দ্রিক। এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের ৪ জন, আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য দলের ৩ জন রয়েছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ১৯৪টি ঘটনায় ১ হাজার ৫৮৫ জন আহত এবং ২৪ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ৭ জন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হন।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ৩৯৫টি ঘটনায় ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত এবং ১২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার লক্ষ্য হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের পরপরই জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে পুলিশ। তিনি বলেন, অনেক ঘটনার পেছনে স্থানীয় আধিপত্য, ময়লা-বাণিজ্য, ফুটপাত, দখল এবং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি এসব অপরাধ সংঘটনে বিভিন্ন সময় অন্য জেলা থেকে ভাড়াটে শ্যুটারও আনা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে এসব সংঘাতের দৃশ্যমান অংশ হলেও এর আড়ালে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বড় ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক মনে করেন, ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, পরিবহন ও দখল ব্যবসার মতো বেআইনি অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাই রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।
তার মতে, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বন্ধের পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

Link copied!