ঢাকা শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

যুদ্ধের ভয়াবহতা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬

যুদ্ধের ভয়াবহতা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বেড়েছে, ছড়িয়ে পড়ছে গোটা অঞ্চলে। সবশেষ জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরাকে ইরান-সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনীর ওপর যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব।
চলমান সংঘাতে ইরানের হামলার তালিকায় যুক্ত হলো মিশর, ভূমধ্যসাগরে দেশটির একটি বন্দরে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে মার্কিন মালিকানাধীন ট্যাংকার।
এর আগে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন হামলার জবাবে বিভিন্ন দেশে তাদের এই হামলা অব্যহত রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা বুধবার ইরানে ব্যাপক হামলা সম্পন্ন করেছে। ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সুবিধা কেন্দ্র, উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা সাইটসহ রেভল্যুশনারি গার্ডের বহু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা এখন আরও বেশি সতর্ক, আক্রমণাত্মক এবং প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানায় সেন্টকম।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা নিশানা করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তিনটি ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে।
জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। নতুন করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটির মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের অন্যতম প্রধান নিশানায় পরিণত হয়েছে।
এদিকে ইরাকে ইরান-সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনীর ওপর যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় চালানো ড্রোন হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।
পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, বাগদাদ, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা, দিয়ালা, ওয়াসিতসহ কয়েকটি প্রদেশে তাদের ঘাঁটিতে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ২০ সদস্য নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।
বৃটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রে জানিয়েছে, বুধবার মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় মার্কিন মালিকানাধীন একটি গ্যাস সংরক্ষণ ট্যাংকারে ড্রোন হামলা হয়েছে।
ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত চলছে। একইসঙ্গে ইয়েমেনে আবার গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত কয়েকদিনে হুতি যোদ্ধারা সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারের বিমানবাহিনী মারিব ও আল-জাওফ প্রদেশে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একইসঙ্গে উভয় পক্ষই যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে।
ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমে এলেও চলতি মাসে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে হুতিরাও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয় হুতিরা। সংগঠনটির নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই এখন হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত ওমানের যৌথ তদারকির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান কঠোর করেছে তেহরান। ওমানের প্রণালীটি ৫০-৫০ ভাগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছে ইরান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানান, তেহরান উপসাগরীয় দেশের নিকটবর্তী যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দক্ষিণ রুট কিংবা এই প্রস্তাবের অধীনে তৃতীয় কোনো রুট স্বীকার করবে না। একইসঙ্গে অন্য কোনো শক্তির মাধ্যমে এই কৌশলগত জলপথে মাইন অপসারণের অভিযানও প্রত্যাখ্যান করেছে তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করলেও, পাল্টাপাল্টি হামলা সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনাকে ফিকে করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আপাতত কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স

Link copied!