সোজাসাপটা রিপোর্ট
ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একাধিক মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায়ে নির্যাতন, মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো ভয়াবহ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অনেকের ভাগ্যে জোটে মৃত্যুও। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর কার্যক্রম শুধু লিবিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সহযোগী ও অর্থ সংগ্রহকারীরা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্তত ১৫ জেলায় ১১৯ জনের বেশি সন্দেহভাজন মানব পাচারকারীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে অন্তত ১৮টি চক্রের সঙ্গে। তদন্তে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জের ৪৪ জনের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তবে তালিকাভুক্ত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারও অবস্থান বিদেশে, আবার কারও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরিচয় ও ঠিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় অন্তত ৪৮ জনকে সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বরগুনায় এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তালিকায় দেশে অবস্থানরত দালালদের পাশাপাশি লিবিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা ব্যক্তিদের নামও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে থাকা সদস্যরা মূলত বিদেশগামী তরুণদের খুঁজে বের করা, যাত্রার ব্যবস্থা করা এবং তাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের কাজ করেন। অন্যদিকে, লিবিয়ায় অবস্থানরত সহযোগীরা সেখানে পৌঁছানো ব্যক্তিদের গ্রহণ করে আটকে রাখা, নির্যাতন এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করার মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। ছোট ছোট স্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে বিদেশভিত্তিক চক্রের সমন্বয়েই এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে নির্যাতনের ঘটনা আলোচনায় আসে ২০২০ সালের ২৮ মে। দেশটির মিজদাহ শহরে জিম্মি অবস্থায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২৫টি মামলা হয়। মামলাগুলোর তদন্তে পাচারকারীদের বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। এসব মামলার একাধিকটিতে সিআইডি অভিযোগপত্রও দিয়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে একটি মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
ওই হত্যাকাণ্ডে নিহত কিশোরগঞ্জের আকাশের ঘটনাও পাচারকারীদের প্রতারণা ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আকাশের ভাই নাজির হোসেন জানান, ঢাকার এক মানব পাচারকারীর মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে আকাশ লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর তাকে বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্য একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাকে আটকে রেখে ১২ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের কাছে পাঠানো তথ্যে আকাশকে বৈদ্যুতিক শক ও লোহার রড দিয়ে মারধরের কথাও উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে লিবিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজনকে পাচার চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নড়াইলের আলাউদ্দিন শেখের নাম রয়েছে। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১২ বছর আগে লিবিয়ায় যান। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের বিরুদ্ধে গত ১৩ এপ্রিল ৩৪ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। চক্রটির সদস্যদের দেশের ১১ জেলায় বিস্তৃত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া এলাকায় আলাউদ্দিন শেখের একটি দোতলা বাড়ি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইতালি পাঠানোর কথা বলে তরুণদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হতো। এরপর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে অর্থ দাবি করা হতো। একই এলাকার আউয়াল ফরাজী এবং তার দুই ভাই রাব্বানী ফরাজী ও রুবেল ফরাজীর নামও এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এসেছে। তাদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তারের পর তার বড় ভাই আউয়াল ফরাজীকে চক্রটির অন্যতম হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। রাব্বানীর বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া কুমিল্লার মানিক ও শরীফ হোসেন, সুনামগঞ্জের আলী হোসেন ও সালেহ আহমদ, মাদারীপুরের নজরুল মোল্লা এবং গোপালগঞ্জের বশির শিকদারসহ আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে এসেছে। দুবাই, ইতালি ও শারজায় অবস্থানরত কয়েকজনের নামও সিআইডির তালিকায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আফ্রিন আহমেদ, সোহাগ হোসেন ওরফে দিল্লি সোহাগ, সেলিম ওরফে সাউথ সেলিম, রাজন ওরফে বুলেট, মনির ওরফে সিটি মনির, আবদুল্লাহ আল ফারুক ওরফে বাঁধন, সনাতন দাশ ওরফে দাদা, জসিম, কাজী শরীফ ও ওয়াসিম বাবুর নাম উল্লেখযোগ্য।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম জানান, ইতালি যাওয়ার আশায় লিবিয়ায় গিয়ে জিম্মিদশায় পড়া বাংলাদেশিদের একটি অংশ দেশে ফিরে এসেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলের ১০ থেকে ১২টি জেলা থেকে লিবিয়ায় যাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, মানব পাচারকারীদের তালিকা তৈরির কাজ এখনো চলছে। কাজ শেষ হলে দেশে সক্রিয় দালাল এবং লিবিয়াভিত্তিক চক্রের সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিকে, বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন, খন্দকার রিফাত হোসেন, মোহাম্মদ নজির, মিকাইল ইসলাম ও রাব্বানী ফরাজী। সর্বশেষ বিভিন্ন অভিযানে আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা, নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, মানব পাচার ঠেকাতে শুধু বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। দেশের ভেতরে যারা তরুণদের প্রলুব্ধ করে, টাকা সংগ্রহ করে এবং বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে এক চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার হলেও একই পথে নতুন করে তরুণদের পাচারের ঝুঁকি থেকে যাবে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সোজাসাপটা রিপোর্ট
ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একাধিক মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায়ে নির্যাতন, মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো ভয়াবহ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অনেকের ভাগ্যে জোটে মৃত্যুও। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর কার্যক্রম শুধু লিবিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সহযোগী ও অর্থ সংগ্রহকারীরা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্তত ১৫ জেলায় ১১৯ জনের বেশি সন্দেহভাজন মানব পাচারকারীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে অন্তত ১৮টি চক্রের সঙ্গে। তদন্তে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জের ৪৪ জনের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তবে তালিকাভুক্ত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারও অবস্থান বিদেশে, আবার কারও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরিচয় ও ঠিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় অন্তত ৪৮ জনকে সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বরগুনায় এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তালিকায় দেশে অবস্থানরত দালালদের পাশাপাশি লিবিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা ব্যক্তিদের নামও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে থাকা সদস্যরা মূলত বিদেশগামী তরুণদের খুঁজে বের করা, যাত্রার ব্যবস্থা করা এবং তাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের কাজ করেন। অন্যদিকে, লিবিয়ায় অবস্থানরত সহযোগীরা সেখানে পৌঁছানো ব্যক্তিদের গ্রহণ করে আটকে রাখা, নির্যাতন এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করার মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। ছোট ছোট স্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে বিদেশভিত্তিক চক্রের সমন্বয়েই এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে নির্যাতনের ঘটনা আলোচনায় আসে ২০২০ সালের ২৮ মে। দেশটির মিজদাহ শহরে জিম্মি অবস্থায় ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২৫টি মামলা হয়। মামলাগুলোর তদন্তে পাচারকারীদের বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। এসব মামলার একাধিকটিতে সিআইডি অভিযোগপত্রও দিয়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে একটি মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
ওই হত্যাকাণ্ডে নিহত কিশোরগঞ্জের আকাশের ঘটনাও পাচারকারীদের প্রতারণা ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আকাশের ভাই নাজির হোসেন জানান, ঢাকার এক মানব পাচারকারীর মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে আকাশ লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর তাকে বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্য একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাকে আটকে রেখে ১২ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের কাছে পাঠানো তথ্যে আকাশকে বৈদ্যুতিক শক ও লোহার রড দিয়ে মারধরের কথাও উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে লিবিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজনকে পাচার চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নড়াইলের আলাউদ্দিন শেখের নাম রয়েছে। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১২ বছর আগে লিবিয়ায় যান। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের বিরুদ্ধে গত ১৩ এপ্রিল ৩৪ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। চক্রটির সদস্যদের দেশের ১১ জেলায় বিস্তৃত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া এলাকায় আলাউদ্দিন শেখের একটি দোতলা বাড়ি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইতালি পাঠানোর কথা বলে তরুণদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হতো। এরপর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে অর্থ দাবি করা হতো। একই এলাকার আউয়াল ফরাজী এবং তার দুই ভাই রাব্বানী ফরাজী ও রুবেল ফরাজীর নামও এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এসেছে। তাদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তারের পর তার বড় ভাই আউয়াল ফরাজীকে চক্রটির অন্যতম হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। রাব্বানীর বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া কুমিল্লার মানিক ও শরীফ হোসেন, সুনামগঞ্জের আলী হোসেন ও সালেহ আহমদ, মাদারীপুরের নজরুল মোল্লা এবং গোপালগঞ্জের বশির শিকদারসহ আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে এসেছে। দুবাই, ইতালি ও শারজায় অবস্থানরত কয়েকজনের নামও সিআইডির তালিকায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আফ্রিন আহমেদ, সোহাগ হোসেন ওরফে দিল্লি সোহাগ, সেলিম ওরফে সাউথ সেলিম, রাজন ওরফে বুলেট, মনির ওরফে সিটি মনির, আবদুল্লাহ আল ফারুক ওরফে বাঁধন, সনাতন দাশ ওরফে দাদা, জসিম, কাজী শরীফ ও ওয়াসিম বাবুর নাম উল্লেখযোগ্য।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম জানান, ইতালি যাওয়ার আশায় লিবিয়ায় গিয়ে জিম্মিদশায় পড়া বাংলাদেশিদের একটি অংশ দেশে ফিরে এসেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলের ১০ থেকে ১২টি জেলা থেকে লিবিয়ায় যাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, মানব পাচারকারীদের তালিকা তৈরির কাজ এখনো চলছে। কাজ শেষ হলে দেশে সক্রিয় দালাল এবং লিবিয়াভিত্তিক চক্রের সদস্যদের সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিকে, বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন, খন্দকার রিফাত হোসেন, মোহাম্মদ নজির, মিকাইল ইসলাম ও রাব্বানী ফরাজী। সর্বশেষ বিভিন্ন অভিযানে আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা, নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, মানব পাচার ঠেকাতে শুধু বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। দেশের ভেতরে যারা তরুণদের প্রলুব্ধ করে, টাকা সংগ্রহ করে এবং বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে এক চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার হলেও একই পথে নতুন করে তরুণদের পাচারের ঝুঁকি থেকে যাবে।

Safari-র নিচের Share (⬆) বাটনে চাপুন, তারপর "Add to Home Screen" বেছে নিন।
আপনার মতামত লিখুন