ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ঢাকায় আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬

ঢাকায় আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত

বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের আসন্ন ঢাকা সফর। তিন দিনের এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্ক, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহের বিষয়গুলো উঠে আসতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গোরের সফরকে শুধুমাত্র একটি রুটিন কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন কাঠামোয় এগোবে, বাংলাদেশ কীভাবে তার পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখবে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ঢাকার ভূমিকা কী হবে, এসব বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটন সরাসরি ধারণা নিতে চায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সফরের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হচ্ছে নতুন সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করা। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এই সফর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি করবে।
সার্জিও গোরের সফরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে চায়, যাতে অতীতের মতবিরোধ পেছনে ফেলে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হতে পারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহী। সে কারণে আলোচনায় আসতে পারে, বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কীভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারসাম্য, মার্কিন পণ্য আমদানি বৃদ্ধি এবং বাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ দূতের সফরে এটি আলোচনায় আসতে পারে। এদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রম অধিকার, কর্মপরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। সে লক্ষ্যে জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওষুধ শিল্প, অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল সেবাখাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় বাজার, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সার্জিও গোরের সফরের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হতে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। ওই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। চীন বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বন্দর উন্নয়ন, শিল্পাঞ্চল, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ইস্যুকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরাসরি ‌‘চীনবিরোধী অবস্থান’ চাপিয়ে দিতে চায় না। বরং তাদের আগ্রহ-বাংলাদেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার কী। অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে চীনের ভূমিকা কতটা। বাংলাদেশ কীভাবে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখছে।
সার্জিও গোরের সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে। সফরের অংশ হিসেবে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি। রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটে বড় মানবিক সহায়তাকারী দেশগুলোর একটি। তবে বাংলাদেশের প্রধান দাবি হচ্ছে, শুধু ত্রাণ নয়, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সার্জিও গোরের সফরকালে আলোচনায় আসতে পারে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, আঞ্চলিক যোগাযোগ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূমিকা। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে থাকায় ঢাকার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সার্জিও গোরের সফর বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। ঢাকার লক্ষ্য থাকবে-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানো। চীনের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। ভারতসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে-বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সব মিলিয়ে সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকে দেখা হচ্ছে নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ভিত্তি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে। সফরে দেওয়া বার্তা আগামী দিনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিক নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর ঢাকা সফরে আসছেন। তার এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সুগম হবে বলে আশা করছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় ভালো। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও জোরদার হচ্ছে এবং হবে। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিনিধি সফরে এলে আমরা মনে করি, এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর করবে। আমরা আশা করি, এ সফরের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু বিষয় সামনে আসবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্ক আরও সুগম হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ আরও এগিয়ে নিতে চায় বাংলাদেশ। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর নিয়ে পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের সফরকে বাংলাদেশের একটি বিশেষ সুযোগ হিসেবে নেয়া উচিৎ। এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ তার প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারে। তবে সার্জিও গোর বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্র নীতির বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করবেন বলে মনে করি। এ ছাড়া তার রোহিঙ্গা ইস্যুতেও একটি বড় ফোকাস থাকবে।
সফরে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে কি না জানতে চাইলে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, এটা তারা সব দেশের সাথেই করেন। প্রতিটি দেশের সাথেই চীনের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণে রাখেন। আর এটা খুবই স্বাভাবিক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর আগামী ৩০ জুলাই ঢাকায় আসছেন। তিন দিনের সফরের তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন।

Link copied!