পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা কর্তৃক লিবিয়ায় বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পরিবারকে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায় চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার এবং গ্রেফতারকৃত ০১ জন আসামী কর্তৃক বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান।
গত ১৭/০৩/২০২৫ ইং তারিখ লিবিয়ার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা অনুমান ০৭.০০ ঘটিকায় লিবিয়া প্রবাসী ইদ্রিস আলী (৫৪), পিতা-মৃত সামাদ আলী, মাতা-আম্বিয়া, গ্রাম-বিজয়নগর, ইউপি-নোয়াগাঁও, থানা-সোনারগাঁও, জেলা-নারায়ণগঞ্জ এর লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি শহরের আনজারা নামক স্থানে বাসার সামনে ৩ (তিন) টি গাড়িতে করে ১। উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪), ২। আসলাম (৩৬), ৩। আরিফ মোল্লা (২৮), ৪। রাজু মিয়া (৪৬) সহ অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জন লোক মিলে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসহ সজ্জিত হয়ে ভাড়া বাসা ঘিরে ফেলে ইদ্রিস আলী কে অস্ত্রের মুখে ভয়-ভীতি দেখায়ে জোরপূর্বক অপহরণ করে। গাড়িতে তুলে চোখ বেধে ফেলে এবং কোন প্রকার কথা বা চিৎকার করতে নিষেধ করে। ইদ্রিস আলী'র পাসপোর্ট, মোবাইল, টাকা এবং রুমে থাকা অন্যান্য ডকুমেন্টস তারা ছিনিয়ে নেয়। গাড়িতে তুলে অনুমান ২-৩ ঘন্টা গাড়ি চালানোর পরে অজ্ঞাত স্থানের একটি বিল্ডিংয়ের রুমে নিয়ে যাওয়ার পর চোখ খুলে দিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে আটক করে রাখে। পরবর্তীতে এভাবে আটক থাকার দুই দিন পর অন্য একটি রুমে নিয়ে মারধর করে উক্ত মারধরের ভিডিও ইদ্রিস আলী'র স্ত্রী ফাতেমা বেগম সোনারগাঁও থানাধীন বিজয়নগর গ্রামস্থ নিজ বাড়িতে অবস্থানকালে গত ১৯/০৩/২০২৫ ইং তারিখ সকাল অনুমান ০৯.০০ ঘটিকার সময় তার মোবাইল নাম্বারে ইমোতে ভিডিও কল দিয়ে মারধরের দৃশ্য দেখায় এবং ইদ্রিস আলী'কে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরবর্তীতে আটকের দুই দিন পর আসামীরা শিপন মিয়া (৩৪) এর নামীয় একটি ইসলামী ব্যাংক একাউন্ট নম্বর দিয়ে ইদ্রিস আলী'র স্ত্রীর নিকট মুুক্তিপন হিসেবে ২০,০০,০০০/-(বিশ লক্ষ) টাকা দাবি করে। অন্যথায় প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ইদ্রিস আলী'র স্ত্রী ফাতেমা বেগম স্বামীর জীবন বাঁচানোর জন্য আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার দেনা করে ঐ দিনই অথ্যাৎ গত ১৯/০৩/২০২৫ ইং তারিখে শিপন মিয়া নামীয় ইসলামী ব্যাংক একাউন্ট নম্বর এ, ইসলামী ব্যাংক লিঃ ভূলতা গাওছিয়া শাখা থেকে ২০,০০,০০০/-(বিশ লক্ষ) টাকা পাঠায়। ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা পাঠানোর পরে তারা দুই দিন কোন মারধর করে নাই। পরবর্তীতে পুনরায় মারধর ও মেরে ফেলার হুমকি ধামকি দিতে থাকে এবং অতিরিক্ত আরো ৩০,০০,০০০/- (ত্রিশ লক্ষ) টাকা দাবি করে অন্যথায় প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে লোহার রড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। আঘাতের ফলে ইদ্রিস আলী'র ডান পা ভেংগে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম হয়। তারা ইদ্রিস আলী'র উপর অমানুষিক শারিরীক ও মানুষিক নির্যাতন চালাতে থাকে এবং দিনে ১ টি মাত্র রুটি ও ১ বোতল পানি দিত। এভাবে দিনের পর দিন তারা মারধর এর পাশাপাশি অনাহারে অর্ধাহারে রাখে। কোন উপায় না পেয়ে স্বামীর জীবন রক্ষার্থে ইদ্রিস আলী'র স্ত্রী নিরুপায় হয়ে তার মেয়ে মাহফুজা বেগম এর জনতা ব্যাংক সোনারগাঁও শাখার একাউন্ট এর মাধ্যমে জনতা ব্যাংক লিঃ সোনারগাঁও শাখা থেকে গত ০৬/০৪/২০২৫ ইং তারিখ দুপুর অনুমান ২.৪০ ঘটিকায় আরটিজিএস করে মোছাঃ মঞ্জু এর নামীয় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক একাউন্ট এ ২৮,০০,০০০/-(আঠাশ লক্ষ) টাকা পাঠায়। মঞ্জু ৪,০০,০০০/- (চার লক্ষ) টাকা রেখে বাকি ২৪,০০,০০০/-(চব্বিশ লক্ষ) টাকা গত ০৭/০৪/২০২৫ইং তারিখে মর্জিনা বেগম এর ইসলামী ব্যাংক একাউন্ট এ পাঠায়। একই সময়ে ইদ্রিস আলী স্ত্রী আসামীদের দেয়া বিকাশ নাম্বারে ২,৫০,০০০/- (দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা পাঠায়। এভাবে বাংলাদেশে থাকা ইদ্রিস আলী'র স্ত্রী ব্যাংক ও বিকাশে সর্বমোট ৫০,৫০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা পাঠায়। পরবর্তীতে ইদ্রিস আলী কে ১ মাস ১৪ দিন আটক রাখার পর গত ০৮/০৪/২০২৫ ইং তারিখে লিবিয়ার স্থানীয় সময় সন্ধা অনুমান ৭.০০ টার দিকে চোখ বেধে গাড়িতে তুলে লিবিয়ার ত্রিপোলি শহরের মদিনা নামক জায়গায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে ইদ্রিস আলী লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ এ্যাম্বাসির সহায়তায় গত ২২/০৭/২০২৫ ইং তারিখে বাংলাদেশে আসেন। উক্ত ঘটনা সংক্রান্তে ভিকটিম ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে এজাহার দিলে সোনারগাঁও থানার মামলা নং- ৪১, তাং- ১৫/০৯/২০২৬ ইং, ধারা-১৪৩/৩৪২/৩২৩/৩২৫/৩৬৫/ ৩৮৫/৩৮৬/৩০৭/১০৯/৫০৬ পেনাল কোড রজু হয়।
উক্ত মামলাটি পিবিআই এর সিডিউল ভূক্ত হওয়ায় পিবিআই হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক মামলাটি পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা কর্তৃক তদন্তের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে মামলাটি গত ১৬/০৯/২০২৬ তারিখে স্ব-উদ্যোগে অধিগ্রহণ পূর্বক এসআই (নিঃ) মফিজুল ইসলাম, পিবিআই নারায়ণগঞ্জ’কে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
পিবিআই প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি জনাব মোঃ মোস্তফা কামাল এর তত্ত্বাবধান ও দিক-নির্দেশনায় এবং পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মোস্তফা কামাল রাশেদ (বিপিএম) এর প্রত্যক্ষ ও সার্বিক সহযোগিতায় তদন্তকালে এসআই (নিঃ) মফিজুল ইসলাম এর নেতৃত্বে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার আভিযানিক টীম তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থনাধীন সাইনবোর্ড এলাকা থেকে এজাহার নামীয় ০১ নং আসামী উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং এজাহার নামীয় ০৭ নং আসামী মর্জিনা বেগম (৩৯) কে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃত উক্ত দুইজন আসামীকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ পূর্বক ০৭(সাত) দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ আদালত ০৩ (তিন) দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করলে রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সংঘবদ্ধ চক্রটি লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কে কাজে লাগিয়ে নিরীহ বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করে জোরপূর্বক অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে অমানুষিক শারিরীক নির্যাতন করে বাংলাদেশে থাকা ভিকটিমের পরিবারে সাথে ভিডিও কলে মারধরের দৃশ্য দেখিয়ে নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিকাশ একাউন্টের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে মর্মে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। অদ্য ২৩/০৯/২০২৬ ইং উক্ত আসামীদ্বয় কে ০৩ (তিন) দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়। আসামী মর্জিনা বেগম (৩৯) বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। উক্ত সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে।

আপনার মতামত লিখুন :