ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার

সোজাসাপটা রিপোর্ট
দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে বাড়তে থাকা সংক্রমণ সেপ্টেম্বর মাসে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বিপুলসংখ্যক রোগী। এক দিনের হিসাবেও নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৫৯৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৫৭ হাজার ৯১০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
মাসভিত্তিক হিসাবে বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়। জুনে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জনের। সেপ্টেম্বরে এসে মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ৮৭ জনে পৌঁছেছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাতেও দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ৬৬২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে এই গড় দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯১ জনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক রোগী ভর্তির চাপ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একইভাবে আগস্টে দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ১ দশমিক ৪ জন, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৪ দশমিক ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরও ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭০৯। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ১৯ হাজার ৬৭০ জন বা ৪৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। তবে মৃত্যুর বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল ১৬৭ জনের, এবার তা বেড়ে হয়েছে ১৭৮ জন—বৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বিষয়টি শুধু আক্রান্তের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। রোগী কখন হাসপাতালে আসছেন, হাসপাতালে আসার সময় তার শারীরিক অবস্থা কেমন, সতর্কতার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল কি না এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে রাজধানীর বাইরেও ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ৯৯৭, খুলনায় ৯ হাজার ৯০৩, চট্টগ্রামে ৮ হাজার ৬৭২, বরিশালে ৮ হাজার ৪৬৭, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৬৩৮, ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৩৬৬, রংপুরে ১ হাজার ৭৬২ এবং সিলেটে ২৭৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৯২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশালে ১৫৪, চট্টগ্রামে ১৬৭, রাজশাহীতে ১৩৭, ময়মনসিংহে ৮২, রংপুরে ৬৫ এবং সিলেটে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকাগুলোতে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৩৮৪ জন।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকাতেও রোগীর চাপ কমেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৭১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে রোগের কারণ শনাক্ত, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং এলাকাভিত্তিক মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় ও বিস্তারের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আগের মাসগুলোর বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও সংক্রমণ কোন পর্যায়ে যায়, সেটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, কোনো এলাকায় রোগী বাড়লে শুধু আক্রান্তের সংখ্যা হিসাব করলেই হবে না, কেন সেখানে সংক্রমণ বাড়ছে সেটিও মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইইডিসিআর মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসাসেবায় এখন পর্যন্ত কোনো ঘাটতির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদেরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে সামনে পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।

Link copied!