সোজাসাপটা রিপোর্ট
আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন করে জোর দিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত প্রায় ৯১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যে ১২টি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী এসব প্রকল্পে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ টাকা ১২ পয়সা। বিপিডিবির একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, একই ধরনের আগের প্রকল্পগুলোর তুলনায় এই দর প্রায় ২ দশমিক ৫ সেন্ট কম।
শুধু বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণেও প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। ব্যাটারি সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হিসাবে, দেশে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত রয়েছে ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের বাইরে রয়েছে ৩৭৮ দশমিক ৫৬ মেগাওয়াট সক্ষমতা।
এর পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৬৮৯ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিপিডিবি। এসব প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি খাতের প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ২০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে হবে ১৫০ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র। কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি এবং বাগেরহাটের মোংলায় ১০০ মেগাওয়াটের আরও একটি প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ঈশ্বরদীতে আরও ৭০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া মৌলভীবাজারের বিবিয়ানা ও সদর, নীলফামারীর জলঢাকা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী এবং নোয়াখালীর সুধারামে ছোট ও মাঝারি আকারের কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্পের সক্ষমতা ১০ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে।
কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুরের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান তিনটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৪০০ মেগাওয়াট। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন প্রকল্পই ২০২৮ সালের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মিশ্রণ পরিকল্পনার অংশ। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান জানান, খুলনা বিভাগের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও সম্পন্ন করেছে অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি (আইআইএফসি)। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক সক্ষমতার ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে বিপিডিবির নিজস্ব ভবন ও জমিতে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য দরপত্রও আহ্বান করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী মনে করেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন উৎসকে কাজে লাগানো গেলে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমানো সম্ভব। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহিত করা গেলে সরকারের বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই এ খাতের বিস্তার ঘটানো সম্ভব।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশও দিয়েছে সরকার।
জাতীয় সংসদে গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোই এ লক্ষ্যের উদ্দেশ্য।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বায়ু, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অ্যাগ্রিভোলটাইক্সসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :