সোজাসাপটা রিপোর্ট
ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িটি বর্তমানে সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে অবহেলা, নিরাপত্তা ও তদারকির অভাবে এর মূল্যবান প্রত্নসম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দ সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের চরম অব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী ভবনটির আদি রূপ নষ্ট হচ্ছে। পুরোনো দরজা-জানালা, কাঠের কারুকাজ, স্থাপত্যশৈলী, দেয়াল ও অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদান যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে মনে করছে স্থানীয়রা।
জানা গেছে,রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে, শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি। প্রায় ৫২ বিঘা জমির ওপর ৯৫টি কক্ষের এই স্থাপত্যটি শুধু কোনো ভবন নয় ১২৫ বছরের সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক মহাকালীন নীরব সাক্ষী। প্রাসাদের ভেতরে কারুকাজ করা পুরনো দেওয়াল, খিলান এবং ৩০ ফুট উঁচু মন্দিরের চূড়া।
১৮৮৯ সালে রাম রতন ব্যানার্জীর উত্তরাধিকারী প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী এ প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা। পরবর্তীতে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে ৯৫টি কক্ষ, নাচঘর, কাঁচারিঘর ও পুকুরসহ এর পূর্ণ রূপ দেন। শতবর্ষ পেরিয়ে আজও এর অপরূপ কারুকাজ মুগ্ধ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের।
কিন্তু ঐতিহ্যের এই উজ্জ্বল স্মারক আজ ধেয়ে আসা এক করুণ পরিস্থিতির মুখে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক সরকারি মুড়াপাড়া কলেজটি সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ায় আশার আলো জেগেছিল সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। কিন্তু সেই কাজ শুরুর আগেই শুরু হয়েছে এক সংঘবদ্ধ চক্রের ধ্বংসলীলা।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি উদ্যোগ ও সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই বাড়িটির বিভিন্ন কক্ষের ঐতিহাসিক কলাই করা দরজা, ভিক্টোরিয়ান আমলের জানালা ও নকশি করা দামি গ্রিল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে একটি অসাধু চক্র। স্থানীয়দের দাবি, তদারকির অভাবে একে একে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে শত বছরের স্মৃতিচিহ্ন। কালের গহ্বরে ঢাকা পড়ার আগেই কি রক্ষা পাবে রূপগঞ্জের এই অমূল্য সম্পদ, নাকি অবহেলার আড়ালেই হারিয়ে যাবে মুড়াপাড়ার ইতিহাস এখন সেটাই দেখার বিষয়।
জমিদার বাড়ি ঘুরতে আসা বেলায়েত মিয়া জানান, জমিদার বাড়িটি রূপগঞ্জের প্রাচীনতম ঐতিহ্যর একটি নিদর্শন। বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসে এই বাড়িটি দেখার জন্য ছবি তোলার জন্য। শত শত লোকের সমাগম হয় প্রতিদিন এখানে।
মোঃ ওসমান মিয়া নামের আরেকজন বলেন, নানা অব্যবস্থাপনায় জরাজীর্ণ ভাবে পড়ে রয়েছে মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি। পাহারাদার কম থাকায় প্রতিনিয়ত চুরির ঘটনা ঘটছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রূপগঞ্জের এই ঐতিহ্যটি বিলুপ্ত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ কলামেন্ট ফোরামের মহাসচিব মীর আব্দুল আলীম বলেন, ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রামরতন ব্যানার্জির প্রাচীন জমিদার বাড়ি। বহু বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি শুধু ইট, কাঠ, দরজা, জানালা আর দেয়ালের সমষ্টি নয়, এটি আমাদের অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। অথচ রাষ্ট্রের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নজরের আড়ালে পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বাড়িটির পুরোনো দরজা, জানালা, কাঠের কারুকাজসহ মূল্যবান বিভিন্ন উপকরণ একে একে খুলে নেওয়া হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে। চোখের সামনে একটি ইতিহাস ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ দেখার যেন কেউ নেই।পুরোনো দরজা-জানালা, কাঠের কারুকাজ, স্থাপত্যশৈলী, দেয়াল ও অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদান যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ স্থপতি, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণবিদদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে স্থাপনাটির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করা যেতে পারে। কোন অংশ মূল, কোনটি সংস্কারযোগ্য এবং কোন উপাদান কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তার একটি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
সরকারি মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ প্রফেসর হাফিজুর রহমান বলেন, জমিদার বাড়ি সংস্কারের জন্য এমপি মহোদয় ডিউ লেটার দিয়েছে। শীঘ্রই তা শুরু হবে। তবে এখানে মাদক সেবীরা দেওয়াল টপকে গিয়ে পুরনো জানালা,দরজাসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করছে। এছাড়া বাড়িটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করা না হলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকির চিন্তা করে আমরা লাইব্রেরী ও ক্লাস কক্ষ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে করার চিন্তা ভাবনা করছি।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, চুরির বিষয়টি আমাদেরকে জানানো হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা পদক্ষেপ নেবো। এছাড়া জমিদার বাড়িতে নাইটগার্ডের বিষয়ে তদন্ত করে দেখবো। মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন :