ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর ফের হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালীর লারাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চারে মার্কিন বাহিনীর হামলার পর ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের ওপর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা বলে জানা গেছে।
হামলার প্রতিশোধ ও শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে আইআরজিসি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালীতে ‘রকেট উৎক্ষেপণ এবং সমুদ্রের পানিতে মাইন স্থাপনের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন তথ্য পাওয়ার পর তারা ‘সীমিত ও নির্ভুল হামলা’ চালিয়েছে।
জবাবে ইরান জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার ভোরে তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরও জানিয়েছে, ইরানি সেনাবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে ইউএইর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ দাবি নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, আল-মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে হামলার খবর ‘ভিত্তিহীন’। অবশ্য একটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা নিশ্চিত করেছে দেশটি।
জুলাইয়ের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান স্থগিত করার পর ইরানে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা বলে জানা গেছে।
লারাক দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসের অদূরে অবস্থিত এবং সরাসরি হরমুজ প্রণালীর ওপর পড়েছে। বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের ব্যবহৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হতো।
ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে ইরান লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোকে তল্লাশির জন্য থামতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে প্রণালী দিয়ে পারাপারের জন্য জাহাজগুলোকে প্রায় ২০ লাখ ডলার করে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে হামলাটি ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের সংবাদমাধ্যমে আইআরজিসির একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার লারাকে ‘মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের’ তীব্র নিন্দা জানায়। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলাকে তারা ‘বৈধ আত্মরক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। তবে আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে আমরা সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেব’।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে তেল অবকাঠামোতে বিস্ফোরণের দৃশ্যসংবলিত কিছু ভিডিও প্রকাশ করেন, যেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে।
এর একটি ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘খার্গ দ্বীপকে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে!’ ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল খার্গ দ্বীপের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে ট্রাম্প দ্বীপটিতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে পোস্টে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক পরিসরে হামলা শুরু করে। জবাবে ইরান ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালায়। একই সঙ্গে সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান।
ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালী একটি সরু জলপথ। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এর প্রস্থ প্রায় ২১ মাইল বা ৩৩ কিলোমিটার।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তার উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল বা ১৩ দশমিক ৮ মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে প্রণালীর জলসীমা এবং জাহাজ চলাচলের পথ পুরোপুরি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়েছে।
ইরান এমন কয়েকটি জাহাজের ওপরও হামলা চালিয়েছে, যেগুলো তার অনুমতি ছাড়া প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে তেহরানের দাবি।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের অংশ হিসেবে ইরান যে সব মাইন পেতে রেখেছিল, সেগুলো বিস্ফোরিত করে ধ্বংস করা হয়েছে অথবা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে কোনো জাহাজ বা নৌযান মাইন স্থাপনের চেষ্টা করলে সেটি ধ্বংস করা হবে বলেও ইরানকে সতর্ক করেছিলেন তিনি।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের এ দাবিকে ‘প্রচারমূলক’ ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এদিকে ওয়াশিংটন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং ইরানের মিত্রদের ওপর গৌণ নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞা অভিযান ঘোষণা করে।
ইরানের কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য এ অভিযানকে মূলত আগের মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতার পরই ওয়াশিংটন নতুন করে এসব অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশটির তেল রপ্তানির সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শনিবার সেন্টকম জানিয়েছে, অবরোধের অংশ হিসেবে তারা তিনটি জাহাজের চলাচল বন্ধ করেছে, দুটি জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে এবং ৮২টি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

Link copied!