বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ লাগলে আমরা সাধারণত নিহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংস হওয়া স্থাপনা কিংবা সামরিক শক্তির লাভ-লোকসানের হিসাব দেখি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের আরেকটি নীরব ও ভয়ানক রূপ আছে।
কোথাও যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু সেই ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের অভিঘাত যুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষের টানাপড়েন পেরিয়ে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও শিল্প উৎপাদনের সংকট হয়ে আমাদের জীবনে প্রবেশ করে।
কোনোক্রমেই যুদ্ধের কোনো পক্ষের সঙ্গে জড়িত না থাকার পরও সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর আসে মারাত্মক আঘাত।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বাংলাদেশের জন্য সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়, যুদ্ধও আমাদের সীমান্তে হয়নি। তবুও এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে, শিল্পকারখানায়, রপ্তানি খাতে ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে আমাদের তেলের ডিপোগুলোতে। বন্ধ হয়ে গেছে বহু কলকারখানা। প্রশ্ন হলো, কেন? কেন বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে সংঘটিত একটি যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে আমাদের দেশে?
এই প্রশ্নের উত্তরটি লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর মধ্যেই। বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের এই জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে। শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয় এই পথ দিয়ে। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যার প্রভাব সোজা এসে পড়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর।
২০২৬ সালের ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ আমাদের স্পষ্ট দেখিয়েছে যে, আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হওয়ায় আমরা কতটা ঝুঁকিতে আছি। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলার থেকে বেড়ে ২২.৫ ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ প্রায় ১২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তখন এর প্রভাবের বাইরে থাকা সম্ভব হয়নি আমাদের। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামও ৭৮ ডলার থেকে বেড়ে ১০৫ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে কাতার ও ওমানের মতো দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে নির্ধারিত সরবরাহ স্থগিত করে দেয়। ফলে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে উন্মুক্ত বাজার থেকে অনেক বেশি দামে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কিনতে হয়।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাসে প্রায় ৭৬০ থেকে ৮৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি বিশাল চাপ। কারণ জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করতে গিয়ে চাপ পড়ে দেশের রিজার্ভের ওপর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের মে মাসে তা নেমে আসে ২৯.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বিভিন্ন পূর্বাভাস বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বছরের শেষে রিজার্ভ থেকে আরও ৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে।
আমাদের এখানে জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় উৎপাদন খাত। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্পকারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারে না। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশের অনেক পোশাক কারখানা ৮৫-৯০ শতাংশ সক্ষমতা থেকে নেমে মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ও ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক শিল্প এলাকায় প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, কোথাও কোথাও এই সময় আরও বেশি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ের ওপর। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। যখন জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যায়, তখন শুধু কারখানার মালিক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র সরবরাহকারী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল লাখো পরিবার।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। আমাদের জ্বালানি সংকট কি শুধুই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নাকি এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যা? দীর্ঘদিন ধরে আমরা জ্বালানি সমস্যাকে মূলত প্রশাসনিক অদক্ষতা, ভর্তুকির চাপ বা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের একটি বড় অংশ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের কোনো একটি কৌশলগত অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘জিওপলিটিক্যাল এনার্জি ভালনারেবিলিটি’ বা ভূরাজনৈতিক জ্বালানি ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ২০২২ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ক্ষুদ্র নবায়নযোগ্য প্রকল্প এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে তারা জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ায়। ফলে ২০২৬ সালের একই সংকটের সময় পাকিস্তানকে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি কিনতে হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে, যা বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক শিক্ষা আছে। আমাদের সুযোগ আছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর ফেরানোর। কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি একটি দেশের স্বনির্ভর জ্বালানি সক্ষমতাসহ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯ টাকা। অথচ আমদানি করা এলএনজি বা তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যয় সংকটকালে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবেও বেশি লাভজনক।
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়েছে। আজকের বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা হয়ত বাংলাদেশের নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের অভিঘাত থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করার ক্ষমতা আমাদের অবশ্যই আছে। এর জন্য আমাদেরকে জরুরিভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, বাংলাদেশের জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। একটি অঞ্চল বা একটি জ্বালানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন গতি আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অনুসন্ধান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার না দিলে আমদানি নির্ভরতা আরও বাড়বে।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আর পরিবেশবান্ধব বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কম। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিতে সৌরচালিত সেচ এবং শিল্প খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
চতুর্থত, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা দেখা দিলে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকলে অর্থনীতির ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০-৩৫ দিনের কৌশলগত রিজার্ভ সক্ষমতা রয়েছে। এটি কমপক্ষে ৯০ দিনের সক্ষমতায় উন্নীত করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, কীভাবে পৃথিবীর এক প্রান্তের সংঘাত অন্য প্রান্তের একটি দেশের শিল্পকারখানা থামিয়ে দিতে পারে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, রাস্তাঘাট স্থবির করে দিতে পারে, কলকারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিতে পারে। আমরা খুব ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের অবস্থা ঠিক কতটা সঙ্গীন। যুদ্ধের সাতে-পাঁচে না থেকেও কীভাবে আমরাই সবার আগে হই তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বীকার। আমাদের জ্বালানি খাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কতটা সংকটে ঘেরা, তা টের পাইয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। সংকট ও ঝুঁকি তো দেখেছি, কিছুটা হয়ত প্রশমিত হয়েও এসেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এবার না হয় গেল কোনোভাবে, কিন্তু পরবর্তী সংকটের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
জ্বালানি স্বাধীনতা হয়ত আগামীকালই অর্জন করা সম্ভব নয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে পদক্ষেপ আমাদের এখনই নিতে হবে। এখনই যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এতটা নাজুক অবস্থায় হয়ত আর ফেলতে পারবে না। আর এ কারণেই যত দ্রুত সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি কৌশলগত রিজার্ভ সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে। কারণ, এগুলো এখন আর শুধু উন্নয়ন নীতি নয়, এগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পূর্বশর্ত।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, জ্বালানি আমদানি শুধু একটি অর্থনৈতিক লেনদেন নয়। এটি একটি মারাত্মক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও। যে দেশ নিজের জ্বালানির জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, সে দেশ বাস্তবে নিজের অর্থনৈতিক ভাগ্যের ওপরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়ত একদিন শেষ হবে। তেলের দামও হয়ত কমে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ নয়। আমাদের জন্য প্রকৃত প্রশ্ন হলো, পরবর্তী সংকট যখন আসবে, তখনো কি আমরা একইভাবে অপ্রস্তুত থাকব? যদি তা না থাকতে চাই, তাহলে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।
লেখক: রবিউল করিম মৃদুল, সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ লাগলে আমরা সাধারণত নিহত মানুষের সংখ্যা, ধ্বংস হওয়া স্থাপনা কিংবা সামরিক শক্তির লাভ-লোকসানের হিসাব দেখি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের আরেকটি নীরব ও ভয়ানক রূপ আছে।
কোথাও যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু সেই ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের অভিঘাত যুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষের টানাপড়েন পেরিয়ে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও শিল্প উৎপাদনের সংকট হয়ে আমাদের জীবনে প্রবেশ করে।
কোনোক্রমেই যুদ্ধের কোনো পক্ষের সঙ্গে জড়িত না থাকার পরও সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর আসে মারাত্মক আঘাত।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বাংলাদেশের জন্য সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়, যুদ্ধও আমাদের সীমান্তে হয়নি। তবুও এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে, শিল্পকারখানায়, রপ্তানি খাতে ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে আমাদের তেলের ডিপোগুলোতে। বন্ধ হয়ে গেছে বহু কলকারখানা। প্রশ্ন হলো, কেন? কেন বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে সংঘটিত একটি যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে আমাদের দেশে?
এই প্রশ্নের উত্তরটি লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর মধ্যেই। বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের এই জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে। শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয় এই পথ দিয়ে। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যার প্রভাব সোজা এসে পড়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর।
২০২৬ সালের ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ আমাদের স্পষ্ট দেখিয়েছে যে, আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হওয়ায় আমরা কতটা ঝুঁকিতে আছি। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলার থেকে বেড়ে ২২.৫ ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ প্রায় ১২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তখন এর প্রভাবের বাইরে থাকা সম্ভব হয়নি আমাদের। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামও ৭৮ ডলার থেকে বেড়ে ১০৫ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে কাতার ও ওমানের মতো দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে নির্ধারিত সরবরাহ স্থগিত করে দেয়। ফলে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে উন্মুক্ত বাজার থেকে অনেক বেশি দামে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কিনতে হয়।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাসে প্রায় ৭৬০ থেকে ৮৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি বিশাল চাপ। কারণ জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করতে গিয়ে চাপ পড়ে দেশের রিজার্ভের ওপর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের মে মাসে তা নেমে আসে ২৯.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বিভিন্ন পূর্বাভাস বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বছরের শেষে রিজার্ভ থেকে আরও ৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে।
আমাদের এখানে জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় উৎপাদন খাত। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্পকারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারে না। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশের অনেক পোশাক কারখানা ৮৫-৯০ শতাংশ সক্ষমতা থেকে নেমে মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ও ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক শিল্প এলাকায় প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, কোথাও কোথাও এই সময় আরও বেশি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ের ওপর। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। যখন জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যায়, তখন শুধু কারখানার মালিক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র সরবরাহকারী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল লাখো পরিবার।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। আমাদের জ্বালানি সংকট কি শুধুই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নাকি এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যা? দীর্ঘদিন ধরে আমরা জ্বালানি সমস্যাকে মূলত প্রশাসনিক অদক্ষতা, ভর্তুকির চাপ বা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের একটি বড় অংশ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের কোনো একটি কৌশলগত অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘জিওপলিটিক্যাল এনার্জি ভালনারেবিলিটি’ বা ভূরাজনৈতিক জ্বালানি ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ২০২২ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ক্ষুদ্র নবায়নযোগ্য প্রকল্প এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে তারা জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ায়। ফলে ২০২৬ সালের একই সংকটের সময় পাকিস্তানকে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি কিনতে হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে, যা বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক শিক্ষা আছে। আমাদের সুযোগ আছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর ফেরানোর। কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি একটি দেশের স্বনির্ভর জ্বালানি সক্ষমতাসহ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯ টাকা। অথচ আমদানি করা এলএনজি বা তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যয় সংকটকালে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবেও বেশি লাভজনক।
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়েছে। আজকের বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা হয়ত বাংলাদেশের নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের অভিঘাত থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করার ক্ষমতা আমাদের অবশ্যই আছে। এর জন্য আমাদেরকে জরুরিভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, বাংলাদেশের জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। একটি অঞ্চল বা একটি জ্বালানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন গতি আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অনুসন্ধান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার না দিলে আমদানি নির্ভরতা আরও বাড়বে।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আর পরিবেশবান্ধব বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কম। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিতে সৌরচালিত সেচ এবং শিল্প খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
চতুর্থত, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা দেখা দিলে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকলে অর্থনীতির ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০-৩৫ দিনের কৌশলগত রিজার্ভ সক্ষমতা রয়েছে। এটি কমপক্ষে ৯০ দিনের সক্ষমতায় উন্নীত করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, কীভাবে পৃথিবীর এক প্রান্তের সংঘাত অন্য প্রান্তের একটি দেশের শিল্পকারখানা থামিয়ে দিতে পারে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, রাস্তাঘাট স্থবির করে দিতে পারে, কলকারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিতে পারে। আমরা খুব ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের অবস্থা ঠিক কতটা সঙ্গীন। যুদ্ধের সাতে-পাঁচে না থেকেও কীভাবে আমরাই সবার আগে হই তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বীকার। আমাদের জ্বালানি খাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কতটা সংকটে ঘেরা, তা টের পাইয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। সংকট ও ঝুঁকি তো দেখেছি, কিছুটা হয়ত প্রশমিত হয়েও এসেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এবার না হয় গেল কোনোভাবে, কিন্তু পরবর্তী সংকটের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
জ্বালানি স্বাধীনতা হয়ত আগামীকালই অর্জন করা সম্ভব নয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে পদক্ষেপ আমাদের এখনই নিতে হবে। এখনই যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এতটা নাজুক অবস্থায় হয়ত আর ফেলতে পারবে না। আর এ কারণেই যত দ্রুত সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি কৌশলগত রিজার্ভ সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে। কারণ, এগুলো এখন আর শুধু উন্নয়ন নীতি নয়, এগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পূর্বশর্ত।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, জ্বালানি আমদানি শুধু একটি অর্থনৈতিক লেনদেন নয়। এটি একটি মারাত্মক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও। যে দেশ নিজের জ্বালানির জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, সে দেশ বাস্তবে নিজের অর্থনৈতিক ভাগ্যের ওপরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়ত একদিন শেষ হবে। তেলের দামও হয়ত কমে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ নয়। আমাদের জন্য প্রকৃত প্রশ্ন হলো, পরবর্তী সংকট যখন আসবে, তখনো কি আমরা একইভাবে অপ্রস্তুত থাকব? যদি তা না থাকতে চাই, তাহলে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।
লেখক: রবিউল করিম মৃদুল, সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Safari-র নিচের Share (⬆) বাটনে চাপুন, তারপর "Add to Home Screen" বেছে নিন।
আপনার মতামত লিখুন