নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর জিন ভর করেছে- আর জিন তাড়ানোর জন্য ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা অসুস্থ শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাতসহ মানসিক অত্যাচারসহ অপচিকিৎসা করার অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে ওই মাদ্রাসাসহ আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক সময় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়ে ওঠে।
এ ব্যাপারে সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জানান, রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ৫নং ক্যানেল এলাকায় তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়। ওই মাদ্রাসায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১২৫ জনই মহিলা শিক্ষার্থী। পাশেই রয়েছে নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেকটি মাদ্রাসা।
পাশের নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জুবায়ের আহমেদ কবিরাজের মাধ্যমে তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর জিন চালান করিয়েছেন- এমন অভিযোগ করেছেন ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা। গত পাঁচ দিন ধরে তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসার ১৩ থেকে ১৪ জন শিক্ষার্থী অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলে মাদ্রাসার শিক্ষকরা অসুস্থ শিক্ষার্থীদের ওপর জিন তাড়ানোর নামে বেত্রাঘাত, মানসিক অত্যাচার ও অপচিকিৎসা শুরু করেন। আর শিক্ষার্থীদের ওপর জিন ভর করেছে- এমন সংবাদে ওই মাদ্রাসাসহ আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা খালেদ হাসান মোরসাদেক অভিযোগ করে জানান, পার্শ্ববর্তী নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জুবায়ের আহমেদ কবিরাজের মাধ্যমে তাদের মাদ্রাসার ক্ষতি করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর জিন চালান করা হয়েছে।
অপরদিকে নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জুবায়ের আহমেদ পাল্টা অভিযোগ করে জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর জিন চালানের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক ঘটনা। অনেক সময় মানসিকভাবে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর সেজন্য রয়েছে হাসপাতাল ও চিকিৎসক। তারা ডাক্তারি কোনো পরামর্শ না নিয়ে আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে।
অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী জানান, গত পাঁচ দিন আগে তিনজন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তারা নিজেরাই নিজেদের আঘাত করতে থাকে। এদের ভয়ে বাকি শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। বাথরুমে যেতে পারছে না ভয়ে। মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী কমে যাচ্ছে। আবার অনেকে বলছেন এটি জিন তাড়ানোর নাটক সাজানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা না করিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছে।
তবে জিন তাড়ানোর নামে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের বিষয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের অত্যাচারের প্রবণতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন জানান, একটি মাদ্রাসায় জিন তাড়ানোর নামে অপচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে আমি জানতে পেরেছি। বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করব না হলে প্রশাসনের শরণাপন্ন হব।
জিন বা ভূত এ ধরনের কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সিদ্দিক নূরে আলম জানান, এটি খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে; আমরা সরেজমিন তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পুরোনো আদি আমলের জিন-ভূতের কাহিনী কাল্পনিক বিষয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাদল কুমার সাহা জানান, মেডিকেল সাইন্স বলে জিন বলতে কিছুই নেই। যদি কোনো শিশু অসুস্থ হয়, ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়, মানসিক যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। কোনো এমবিবিএস ডাক্তার অথবা মানসিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তার কোনো মানসিক বা অন্যান্য সমস্যা আছে কিনা তার যাচাই করে চিকিৎসা দিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :