দৈনিক সোজা সাপটা

মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হঠাৎ করেই জোরালো হয়ে

আতঙ্কে সন্ত্রাসীরা!



আতঙ্কে সন্ত্রাসীরা!
আতঙ্কে সন্ত্রাসীরা!

সোজাসাপটা রিপোর্ট
মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হঠাৎ করেই জোরালো হয়ে উঠেছে। জেলা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে বলে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে জেলার অপরাধী মহলে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধেও নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও র‌্যাব পৃথকভাবে অভিযান চালানোর পাশাপাশি যৌথ অভিযানেও যেতে পারে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের বিষয়ে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে। সে ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকেই ছাড় না দেওয়ার নীতিতে এগোবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অভিযানকে অনেকেই ‘চিরুনি অভিযান’ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ অভিযানের শুরুতেই নারায়ণগঞ্জে বড় সংখ্যায় গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জেলার সাত থানায় পরিচালিত প্রথম দিনের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ১২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী, কিশোর গ্যাং এবং ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের ধরতে ওই অভিযান পরিচালিত হয়।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সদর, ফতুল্লা, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার থানার পুলিশ এতে অংশ নেয়।
এর পরদিন ৬ সেপ্টেম্বরও একই সময়সীমায় সাত থানায় অভিযান চালানো হয়। ওই দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় আরও ১০৬ জনকে। এর মধ্যে সদর মডেল থানায় ২২ জন মাদকসেবী, ফতুল্লায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীসহ ৩১ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ১৪ জন, রূপগঞ্জে ১৮ জন, সোনারগাঁওয়ে ৫ জন এবং আড়াইহাজারে ৫ জনকে আটক করা হয়।
বন্দর থানার অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে মাদকসেবী, মাদকসহ আটক ব্যক্তি, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এবং ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এ সময় গাঁজা, ইয়াবা, সুইচ গিয়ার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।
ফতুল্লার অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১ কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজা ও ৮০ পিস ইয়াবা। বন্দরে একজনের কাছ থেকে গাঁজার পুরিয়া এবং আরেকজনের কাছ থেকে ৯ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে সুইচ গিয়ার ও ৪ হাজার টাকা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যে পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর জেলার বিভিন্ন থানা থেকে মোট ১২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সদর এলাকায় ৫৫ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন, বন্দরে ১১ জন, ফতুল্লায় ১৯ জন, সোনারগাঁওয়ে ৮ জন, রূপগঞ্জে ৬ জন এবং আড়াইহাজারে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, জেলার অপরাধ দমনে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তবে পৃথক দিনের অভিযান ও সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব আলাদা সময়সীমার হওয়ায় এসব সংখ্যা একসঙ্গে যোগ করে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জে অপরাধ দমনে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের ধরন অনুযায়ী দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে প্রশাসনের।
নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। ফলে পুলিশের নতুন নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে অপরাধ দমনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে; এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও মাদকবিরোধী অভিযান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অপরাধ দমনের এই কঠোর অবস্থানের সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দলীয় নেতাকর্মীদেরও সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ভূমিদস্যুতার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার খবর রয়েছে। সামনে এসব বিষয়ে সরকারিভাবে সারাদেশে বড় ধরনের অভিযান হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তার বক্তব্যের মূল বার্তা—অপরাধ করলে দলীয় পরিচয় কোনো সুরক্ষা দেবে না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো দলের পরিচয় যাই হোক, আইন সবার জন্য সমান। বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী যেন এ ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে কারাবরণ না করেন, সেটিও তিনি প্রত্যাশা করেন।
দেশে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা অভিযান নিয়ে আলোচনা উঠলে বিএনপি সরকারের আমলের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর কথাও সামনে আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০৩ সালে ওই অভিযান শুরু হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের গ্রেপ্তার, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া এবং দেশত্যাগের ঘটনাও আলোচনায় এসেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অবশ্য সেই অভিযানের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তবে এবারের অভিযানও যে সাধারণ নিয়মিত অভিযানের তুলনায় বেশি জোরালো হতে যাচ্ছে, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার, অস্ত্র-মাদক উদ্ধারের তৎপরতা এবং সম্ভাব্য যৌথ অভিযানের প্রস্তুতিতে তারই ইঙ্গিত মিলছে।
নারায়ণগঞ্জে গত দুই দিনের অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার এবং সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১২৪ জনকে আটকের তথ্যের পর এখন মূল প্রশ্ন—এই অভিযান কতদূর গড়ায়। অপরাধীদের তালিকা যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর যদি পরিকল্পিত চিরুনি অভিযান শুরু হয়, তাহলে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও ধারাবাহিক অভিযানের কারণে ইতোমধ্যে অপরাধী মহলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে তা কতটা বাস্তব আতঙ্কে রূপ নেয়—সেদিকেই এখন নজর নারায়ণগঞ্জবাসীর।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক সোজা সাপটা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


আতঙ্কে সন্ত্রাসীরা!

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সোজাসাপটা রিপোর্ট
মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হঠাৎ করেই জোরালো হয়ে উঠেছে। জেলা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে বলে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে জেলার অপরাধী মহলে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধেও নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও র‌্যাব পৃথকভাবে অভিযান চালানোর পাশাপাশি যৌথ অভিযানেও যেতে পারে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের বিষয়ে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে। সে ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকেই ছাড় না দেওয়ার নীতিতে এগোবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অভিযানকে অনেকেই ‘চিরুনি অভিযান’ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ অভিযানের শুরুতেই নারায়ণগঞ্জে বড় সংখ্যায় গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জেলার সাত থানায় পরিচালিত প্রথম দিনের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ১২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী, কিশোর গ্যাং এবং ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের ধরতে ওই অভিযান পরিচালিত হয়।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সদর, ফতুল্লা, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার থানার পুলিশ এতে অংশ নেয়।
এর পরদিন ৬ সেপ্টেম্বরও একই সময়সীমায় সাত থানায় অভিযান চালানো হয়। ওই দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় আরও ১০৬ জনকে। এর মধ্যে সদর মডেল থানায় ২২ জন মাদকসেবী, ফতুল্লায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীসহ ৩১ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ১৪ জন, রূপগঞ্জে ১৮ জন, সোনারগাঁওয়ে ৫ জন এবং আড়াইহাজারে ৫ জনকে আটক করা হয়।
বন্দর থানার অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে মাদকসেবী, মাদকসহ আটক ব্যক্তি, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এবং ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এ সময় গাঁজা, ইয়াবা, সুইচ গিয়ার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।
ফতুল্লার অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১ কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজা ও ৮০ পিস ইয়াবা। বন্দরে একজনের কাছ থেকে গাঁজার পুরিয়া এবং আরেকজনের কাছ থেকে ৯ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে সুইচ গিয়ার ও ৪ হাজার টাকা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যে পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর জেলার বিভিন্ন থানা থেকে মোট ১২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সদর এলাকায় ৫৫ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন, বন্দরে ১১ জন, ফতুল্লায় ১৯ জন, সোনারগাঁওয়ে ৮ জন, রূপগঞ্জে ৬ জন এবং আড়াইহাজারে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, জেলার অপরাধ দমনে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তবে পৃথক দিনের অভিযান ও সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব আলাদা সময়সীমার হওয়ায় এসব সংখ্যা একসঙ্গে যোগ করে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জে অপরাধ দমনে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের ধরন অনুযায়ী দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে প্রশাসনের।
নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। ফলে পুলিশের নতুন নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে অপরাধ দমনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে; এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও মাদকবিরোধী অভিযান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অপরাধ দমনের এই কঠোর অবস্থানের সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান দলীয় নেতাকর্মীদেরও সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ভূমিদস্যুতার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার খবর রয়েছে। সামনে এসব বিষয়ে সরকারিভাবে সারাদেশে বড় ধরনের অভিযান হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তার বক্তব্যের মূল বার্তা—অপরাধ করলে দলীয় পরিচয় কোনো সুরক্ষা দেবে না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো দলের পরিচয় যাই হোক, আইন সবার জন্য সমান। বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী যেন এ ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে কারাবরণ না করেন, সেটিও তিনি প্রত্যাশা করেন।
দেশে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা অভিযান নিয়ে আলোচনা উঠলে বিএনপি সরকারের আমলের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর কথাও সামনে আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০৩ সালে ওই অভিযান শুরু হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের গ্রেপ্তার, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া এবং দেশত্যাগের ঘটনাও আলোচনায় এসেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অবশ্য সেই অভিযানের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তবে এবারের অভিযানও যে সাধারণ নিয়মিত অভিযানের তুলনায় বেশি জোরালো হতে যাচ্ছে, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার, অস্ত্র-মাদক উদ্ধারের তৎপরতা এবং সম্ভাব্য যৌথ অভিযানের প্রস্তুতিতে তারই ইঙ্গিত মিলছে।
নারায়ণগঞ্জে গত দুই দিনের অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার এবং সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১২৪ জনকে আটকের তথ্যের পর এখন মূল প্রশ্ন—এই অভিযান কতদূর গড়ায়। অপরাধীদের তালিকা যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর যদি পরিকল্পিত চিরুনি অভিযান শুরু হয়, তাহলে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও ধারাবাহিক অভিযানের কারণে ইতোমধ্যে অপরাধী মহলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে তা কতটা বাস্তব আতঙ্কে রূপ নেয়—সেদিকেই এখন নজর নারায়ণগঞ্জবাসীর।


দৈনিক সোজা সাপটা

সম্পাদক :
আবু সাউদ মাসুদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
আতঙ্কে সন্ত্রাসীরা!
0:00 / 0:00
1x