দৈনিক সোজা সাপটা

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সাইবার জগতেও ক্রমশ বাড়ছে অপরাধ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না বাংলাদেশের

সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক



সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সাইবার জগতেও ক্রমশ বাড়ছে অপরাধ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না বাংলাদেশের আইন।
যে কারণে গত দুই দশকে এ নিয়ে চারবার আইন হয়েছে। সম্প্রতি আইনে নতুন করে সংশোধনী প্রস্তাব করছে সরকার।
খসড়া প্রস্তাবনা প্রকাশের পরপরই শুরু হয় বিতর্ক। নতুন আইনটি পূর্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিপীড়নের হাতিয়ার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সরকার বলছে, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হবে সংশোধনী।
সাইবার জগতের অপরাধের বিচারে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম আইন হয় ২০০৬ সালে।
চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে তথ্যপ্রযুক্তি আইন পাস হলেও সে সময় তেমন প্রয়োগ হয়নি। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সরকারের সময় কঠোর প্রয়োগের ফলে এই আইনের বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ওই আইনের ৫৭ ধারাকে নিপীড়নের হাতিয়ার বলে অভিহিত করা হয়। সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বাতিল করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করে। তবে সেই আইনটিও একইভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। যে কারণে ২০২৩ সালে ফের সাইবার নিরাপত্তা আইন পাস করে শেখ হাসিনা সরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর পরিবর্তে তারা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করে। সেই অধ্যাদেশটি চলতি বছর ১০ এপ্রিল আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার।
তবে নতুন আইনটি জাতীয় সংসদে পাশের তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তা পর্যালোচনার ঘোষণা দেয় সরকার। গঠন করা হয় ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি। সেই কমিটির পর্যালোচনা শেষে প্রণীত খসড়া নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর খসড়া সংশোধনী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে মতামত প্রদানের জন্য প্রকাশ করা হয়।
সংশোধনীর খসড়ায় যা বলা হয়েছে
সাইবার নিরাপত্তা আইনের বেশ কিছু ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে বিদ্যমান আইনের ৮(৩) ধারায় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হলে সরকার কোনো কনটেন্ট ব্লক করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ‘কোনো কন্টেন্ট ব্লক করা হইলে স্বচ্ছতার স্বার্থে সরকার সকল ব্লক হওয়া কন্টেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ সংশোধনীতে জনসম্মুখে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
আগে ৮(৪) ধারা অনুযায়ী কোনো তথ্য উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার তিনদিনের মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালের অনুমতির বিধান বাধ্যতামূলক ছিল। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি না দিলে সেসব তথ্য অবমুক্ত করার বিধান ছিল। বিদ্যমান আইনে ট্রাইব্যুনালের অনুমতির বিধানটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পরিবর্তে আদেশ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা এজেন্সি ইচ্ছা করলে আদালতে অনুমতি চাওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেই আবেদন নিষ্পত্তি করতে সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনের ১২ ধারায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল রয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে, কাউন্সিলে স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে এই কাউন্সিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান থাকলেও সংশোধনীতে তাকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেস অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নের কনটেন্ট রাখে, যা প্রকাশ, প্রচারের হুমকি দেন বা যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে তা অপরাধ হবে। এখন সংশোধনীর খসড়ায় এসব অপরাধের সঙ্গে ‘মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন বা বুলিং’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে।
মানহানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হবে। কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত বা প্রদর্শিত এমন যে কোনো তথ্য, উপাত্ত, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিক্সও অন্তর্ভুক্ত হবে। যা মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর এবং যা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণকৃত, সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
হেয় প্রতিপন্নের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থানকে কোনো কথা, আচরণ, প্রকাশনা, ইঙ্গিত বা কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা, যা ওই ব্যক্তি অন্যের কাছে অপমানিত, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট বা অসম্মানজনক করে তোলে।
বুলিংয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক, তাহার প্রকৃত বা অনুমিত ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রাধান্য ব্যবহার করিয়া, অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি সংঘটিত কোনো ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ বা কার্যক্রম যা শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক, ডিজিটাল বা অন্য কোনো মাধ্যমে সংঘটিত বা প্রকাশিত হতে পারে এবং যার ফলে উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি বা পীড়ার শিকার হয়, ভীতসন্ত্রস্ত হয় অথবা সামাজিক বর্জন, বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে এই ধারার অপরাধের সাজা দুই বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। সংশোধনীতে সাজা বৃদ্ধি করে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই ধারার অপরাধ আগের মতোই জামিনযোগ্য থাকছে।
নতুন করে আইনে ২৬(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে।
গুজবের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে। অপতথ্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি।
খসড়া আইনের ২৯ ধারায় কোম্পানির ক্ষেত্রে অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে কোম্পানির সংজ্ঞায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংঘ বা সংগঠনের সঙ্গে ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানির অপরাধের ক্ষেত্রে আগে শুধু অর্থদণ্ডের বিধান ছিল। যেখানে ২৯(৩) ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত উক্ত কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার আদেশ দিতে পারবে।
বিদ্যমান পদ্ধতিতে এই আইনের অধীনে সমস্ত অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হয়। সংশোধনীতে কতিপয় অপরাধের বিচারের ক্ষমতা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ও মোবাইল কোর্টকে দেওয়া হয়েছে।
এই আইনের ৪৯ ধারায় সরকারকে কন্টেন্ট অপসারণের ক্ষমতা বা ব্লককরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমা নির্ধারণ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর নতুনভাবে ৫২ ধারা যুক্ত করে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে তাদের কাজের জন্য দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের উদ্বেগ: সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনার পরই বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নতুনভাবে আইনটি প্রণীত হলে তা নিপীড়নের হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
সংশোধনীর খসড়া প্রকাশের পরই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। খসড়া আইনটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিতাহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশকিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার ও বিশেষ করে বাক্-স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। অধিকন্তু, ‘‘যৌনহয়রানি’’ ও ‘‘সেক্সটর্শন’’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে এমন অপেশাদার ও অসম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা প্রকৃত অপরাধকে আড়াল করে অভিযুক্তের সুরক্ষা আর ভুক্তভোগীর অধিকার হরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল এর উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের সমন্বয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের ‘‘তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক’’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুইজনের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। এই দুইজন আবার সরকারকর্তৃক মনোনীত হবেন। ফলে ‘‘সুরক্ষা কাউন্সিল’’ সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন অবস্থায় কোনো প্রকার জবাবদিহিহীনভাবে এ আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করবে। অতএব, এ ধরনের ধারাসমূহ ঢেলে সাজিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানাই।’
নতুন আইন সাংবাদিক নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় কোনো সংবাদ ‘অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত’ মনে হলেই তা নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে এই সংশোধনীর ফলে। যেখানে এই সংশোধনী গৃহীত হলে সাংবাদিকদের এমন অপরাধের জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি হতে পারে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের প্রতিবেদন আটকে দেওয়া এবং সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতাও পেয়ে যাবে কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী এতটাই বিস্তৃত তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। সাংবাদিকদের স্বতন্ত্রভাবে সংগৃহীত ও যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করার সুযোগ থাকা আবশ্যক, এমনকি কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেনি এমন তথ্যও।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সাইবার আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের নির্যাতন ও কণ্ঠরোধ করার ইতিহাস রয়েছে। অপতথ্য মোকাবিলার আড়ালে বর্তমান সরকারের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো উচিত নয়।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি মনে করে পূর্বের মতো তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের উদাহরণ টেনে প্রস্তাবিত সংশোধনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুজব হিসেবে “অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য” এবং অপতথ্য হিসেবে “মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য”-এর কথা বলা হলেও এসব ধারণার প্রয়োগের সীমা ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো তথ্য অযাচাইকৃত হওয়া এবং মিথ্যা হওয়া এক বিষয় নয়। সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে “অযাচাইকৃত” তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়া বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা তথ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তুলে ধরেছে বিরোধী দল। এ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
এসব আইনের অতীত অপব্যবহারের নজির থাকায়, একই ধরনের বিধান পুনরায় প্রবর্তন করা হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করেন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট-এর নির্বাহী সভাপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন হালনাগাদ করা আবশ্যক। তবে খসড়াটি বর্তমান রূপে অনুমোদিত হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব আইনের অতীত অপব্যবহারের নজির থাকায়, একই ধরনের বিধান পুনরায় প্রবর্তন করা হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী।
তিনি আরও বলেন, অনেক নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। ‘অপতথ্য’, ‘গুজব’, ‘হেয় প্রতিপন্ন করা’ অপরাধগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়ন করা হয়নি। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অবারিত সুযোগ থাকবে। ফলে বিনা অপরাধে নাগরিকদের হয়রানি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রাগত বিবেচনায় অধিক পরিমাণ শাস্তির বিধান থাকায় আইনটির প্রায়োগিক দুর্বলতা রয়ে যাবে।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক স্পেশাল প্রসিকিউটরাল অ্যাডভাইজার (অ্যাটর্নি জেনারেল সমমর্যাদায়) অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী মনে করেন, সময়ের প্রয়োজনে আইনের সংশোধন হতে পারে। তবে তার আগে যেন অংশীজনদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করা হয়।
এই আইন বিশেষজ্ঞ বাংলানিউজকে বলেন, কোডিফাইড ল’ সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন হতে পারে। পূর্ববর্তী আইনে যদি কিছু অস্পষ্ট থাকে তবে তা সুনির্দিষ্ট করার জন্য সংশোধনী আনা হলে এটা দোষের কিছু নয়। তবে সেই সংশোধনের উদ্দেশ্য যাতে হয় সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আইনকে এমনভাবে সংশোধন করা উচিত, যাতে চলমান অপরাধের সঙ্গে আইনের বিধান সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে আইনটি চূড়ান্ত করার পূর্বে যাতে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, তবে সংশোধন করতে গিয়ে যাতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার স্বাধীনতার নামে যাতে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
তবে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী এখনও চূড়ান্ত নয় বলে উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গত ১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সকল অংশীজনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা সংশোধন করা হবে। বর্তমানে এটি খসড়া পর্যায়ে আছে। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনের সংশোধন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতে ব্যক্তির সম্মানহানি যাতে না হয়, সে বিষয়টিকে নজরে রেখেই কার্যক্রম চলমান আছে।’

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক সোজা সাপটা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সাইবার জগতেও ক্রমশ বাড়ছে অপরাধ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না বাংলাদেশের আইন।
যে কারণে গত দুই দশকে এ নিয়ে চারবার আইন হয়েছে। সম্প্রতি আইনে নতুন করে সংশোধনী প্রস্তাব করছে সরকার।
খসড়া প্রস্তাবনা প্রকাশের পরপরই শুরু হয় বিতর্ক। নতুন আইনটি পূর্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিপীড়নের হাতিয়ার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সরকার বলছে, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হবে সংশোধনী।
সাইবার জগতের অপরাধের বিচারে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম আইন হয় ২০০৬ সালে।
চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে তথ্যপ্রযুক্তি আইন পাস হলেও সে সময় তেমন প্রয়োগ হয়নি। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সরকারের সময় কঠোর প্রয়োগের ফলে এই আইনের বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ওই আইনের ৫৭ ধারাকে নিপীড়নের হাতিয়ার বলে অভিহিত করা হয়। সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বাতিল করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করে। তবে সেই আইনটিও একইভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। যে কারণে ২০২৩ সালে ফের সাইবার নিরাপত্তা আইন পাস করে শেখ হাসিনা সরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর পরিবর্তে তারা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করে। সেই অধ্যাদেশটি চলতি বছর ১০ এপ্রিল আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার।
তবে নতুন আইনটি জাতীয় সংসদে পাশের তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তা পর্যালোচনার ঘোষণা দেয় সরকার। গঠন করা হয় ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি। সেই কমিটির পর্যালোচনা শেষে প্রণীত খসড়া নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর খসড়া সংশোধনী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে মতামত প্রদানের জন্য প্রকাশ করা হয়।
সংশোধনীর খসড়ায় যা বলা হয়েছে
সাইবার নিরাপত্তা আইনের বেশ কিছু ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে বিদ্যমান আইনের ৮(৩) ধারায় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হলে সরকার কোনো কনটেন্ট ব্লক করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ‘কোনো কন্টেন্ট ব্লক করা হইলে স্বচ্ছতার স্বার্থে সরকার সকল ব্লক হওয়া কন্টেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ সংশোধনীতে জনসম্মুখে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
আগে ৮(৪) ধারা অনুযায়ী কোনো তথ্য উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার তিনদিনের মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালের অনুমতির বিধান বাধ্যতামূলক ছিল। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি না দিলে সেসব তথ্য অবমুক্ত করার বিধান ছিল। বিদ্যমান আইনে ট্রাইব্যুনালের অনুমতির বিধানটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পরিবর্তে আদেশ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা এজেন্সি ইচ্ছা করলে আদালতে অনুমতি চাওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেই আবেদন নিষ্পত্তি করতে সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনের ১২ ধারায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল রয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে, কাউন্সিলে স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে এই কাউন্সিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান থাকলেও সংশোধনীতে তাকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেস অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নের কনটেন্ট রাখে, যা প্রকাশ, প্রচারের হুমকি দেন বা যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে তা অপরাধ হবে। এখন সংশোধনীর খসড়ায় এসব অপরাধের সঙ্গে ‘মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন বা বুলিং’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে।
মানহানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত ব্যাখ্যা প্রযোজ্য হবে। কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত বা প্রদর্শিত এমন যে কোনো তথ্য, উপাত্ত, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিক্সও অন্তর্ভুক্ত হবে। যা মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর এবং যা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণকৃত, সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
হেয় প্রতিপন্নের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থানকে কোনো কথা, আচরণ, প্রকাশনা, ইঙ্গিত বা কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা, যা ওই ব্যক্তি অন্যের কাছে অপমানিত, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট বা অসম্মানজনক করে তোলে।
বুলিংয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক, তাহার প্রকৃত বা অনুমিত ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রাধান্য ব্যবহার করিয়া, অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি সংঘটিত কোনো ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ বা কার্যক্রম যা শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক, ডিজিটাল বা অন্য কোনো মাধ্যমে সংঘটিত বা প্রকাশিত হতে পারে এবং যার ফলে উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি বা পীড়ার শিকার হয়, ভীতসন্ত্রস্ত হয় অথবা সামাজিক বর্জন, বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে এই ধারার অপরাধের সাজা দুই বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। সংশোধনীতে সাজা বৃদ্ধি করে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই ধারার অপরাধ আগের মতোই জামিনযোগ্য থাকছে।
নতুন করে আইনে ২৬(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে।
গুজবের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে। অপতথ্যের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি।
খসড়া আইনের ২৯ ধারায় কোম্পানির ক্ষেত্রে অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে কোম্পানির সংজ্ঞায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংঘ বা সংগঠনের সঙ্গে ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানির অপরাধের ক্ষেত্রে আগে শুধু অর্থদণ্ডের বিধান ছিল। যেখানে ২৯(৩) ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত উক্ত কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার আদেশ দিতে পারবে।
বিদ্যমান পদ্ধতিতে এই আইনের অধীনে সমস্ত অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হয়। সংশোধনীতে কতিপয় অপরাধের বিচারের ক্ষমতা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ও মোবাইল কোর্টকে দেওয়া হয়েছে।
এই আইনের ৪৯ ধারায় সরকারকে কন্টেন্ট অপসারণের ক্ষমতা বা ব্লককরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমা নির্ধারণ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর নতুনভাবে ৫২ ধারা যুক্ত করে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে তাদের কাজের জন্য দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের উদ্বেগ: সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনার পরই বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নতুনভাবে আইনটি প্রণীত হলে তা নিপীড়নের হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
সংশোধনীর খসড়া প্রকাশের পরই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। খসড়া আইনটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিতাহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশকিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার ও বিশেষ করে বাক্-স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। অধিকন্তু, ‘‘যৌনহয়রানি’’ ও ‘‘সেক্সটর্শন’’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে এমন অপেশাদার ও অসম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা প্রকৃত অপরাধকে আড়াল করে অভিযুক্তের সুরক্ষা আর ভুক্তভোগীর অধিকার হরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল এর উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের সমন্বয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের ‘‘তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক’’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুইজনের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। এই দুইজন আবার সরকারকর্তৃক মনোনীত হবেন। ফলে ‘‘সুরক্ষা কাউন্সিল’’ সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন অবস্থায় কোনো প্রকার জবাবদিহিহীনভাবে এ আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করবে। অতএব, এ ধরনের ধারাসমূহ ঢেলে সাজিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানাই।’
নতুন আইন সাংবাদিক নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় কোনো সংবাদ ‘অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত’ মনে হলেই তা নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে এই সংশোধনীর ফলে। যেখানে এই সংশোধনী গৃহীত হলে সাংবাদিকদের এমন অপরাধের জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি হতে পারে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের প্রতিবেদন আটকে দেওয়া এবং সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতাও পেয়ে যাবে কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী এতটাই বিস্তৃত তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। সাংবাদিকদের স্বতন্ত্রভাবে সংগৃহীত ও যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করার সুযোগ থাকা আবশ্যক, এমনকি কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেনি এমন তথ্যও।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সাইবার আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের নির্যাতন ও কণ্ঠরোধ করার ইতিহাস রয়েছে। অপতথ্য মোকাবিলার আড়ালে বর্তমান সরকারের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো উচিত নয়।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি মনে করে পূর্বের মতো তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের উদাহরণ টেনে প্রস্তাবিত সংশোধনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুজব হিসেবে “অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য” এবং অপতথ্য হিসেবে “মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য”-এর কথা বলা হলেও এসব ধারণার প্রয়োগের সীমা ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো তথ্য অযাচাইকৃত হওয়া এবং মিথ্যা হওয়া এক বিষয় নয়। সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে “অযাচাইকৃত” তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়া বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা তথ্য মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তুলে ধরেছে বিরোধী দল। এ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
এসব আইনের অতীত অপব্যবহারের নজির থাকায়, একই ধরনের বিধান পুনরায় প্রবর্তন করা হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করেন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট-এর নির্বাহী সভাপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন হালনাগাদ করা আবশ্যক। তবে খসড়াটি বর্তমান রূপে অনুমোদিত হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব আইনের অতীত অপব্যবহারের নজির থাকায়, একই ধরনের বিধান পুনরায় প্রবর্তন করা হলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী।
তিনি আরও বলেন, অনেক নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। ‘অপতথ্য’, ‘গুজব’, ‘হেয় প্রতিপন্ন করা’ অপরাধগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়ন করা হয়নি। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অবারিত সুযোগ থাকবে। ফলে বিনা অপরাধে নাগরিকদের হয়রানি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রাগত বিবেচনায় অধিক পরিমাণ শাস্তির বিধান থাকায় আইনটির প্রায়োগিক দুর্বলতা রয়ে যাবে।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক স্পেশাল প্রসিকিউটরাল অ্যাডভাইজার (অ্যাটর্নি জেনারেল সমমর্যাদায়) অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী মনে করেন, সময়ের প্রয়োজনে আইনের সংশোধন হতে পারে। তবে তার আগে যেন অংশীজনদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করা হয়।
এই আইন বিশেষজ্ঞ বাংলানিউজকে বলেন, কোডিফাইড ল’ সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন হতে পারে। পূর্ববর্তী আইনে যদি কিছু অস্পষ্ট থাকে তবে তা সুনির্দিষ্ট করার জন্য সংশোধনী আনা হলে এটা দোষের কিছু নয়। তবে সেই সংশোধনের উদ্দেশ্য যাতে হয় সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আইনকে এমনভাবে সংশোধন করা উচিত, যাতে চলমান অপরাধের সঙ্গে আইনের বিধান সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে আইনটি চূড়ান্ত করার পূর্বে যাতে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, তবে সংশোধন করতে গিয়ে যাতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার স্বাধীনতার নামে যাতে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
তবে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী এখনও চূড়ান্ত নয় বলে উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গত ১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সকল অংশীজনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা সংশোধন করা হবে। বর্তমানে এটি খসড়া পর্যায়ে আছে। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনের সংশোধন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতে ব্যক্তির সম্মানহানি যাতে না হয়, সে বিষয়টিকে নজরে রেখেই কার্যক্রম চলমান আছে।’


দৈনিক সোজা সাপটা

সম্পাদক :
আবু সাউদ মাসুদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
0:00 / 0:00
1x