দৈনিক সোজা সাপটা

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায়

বাড়ল লোডশেডিংয়ের চাপ



বাড়ল লোডশেডিংয়ের চাপ
বাড়ল লোডশেডিংয়ের চাপ

সোজাসাপটা রিপোর্ট
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে। এতে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে অন্য কেন্দ্রগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে লোডশেডিংয়ে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আদানির একটি ইউনিটের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। এর আগে আগস্টের শেষ দিক থেকে দিনের বেলায় আদানি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সময় প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।
পিডিবির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বয়লার ঠান্ডা হতে প্রায় দুই দিন সময় লাগবে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। সব ধরনের কাজ শেষ করে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রভাব বৃহস্পতিবার সারা দিনই বিদ্যুৎ সরবরাহে দেখা যায়। ওই দিন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। সে সময় সরবরাহ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ ওই সময় চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক থাকলেও এর পেছনে বড় কারণ ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়া। রাত ৯টার দিকে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৪ হাজার ৮৭৯ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৬ মেগাওয়াট।
পিডিবি সূত্র বলছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হতে পারে। কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যার কারণে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভারী জ্বালানি তেল বা ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে স্বাভাবিক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করা হচ্ছে।
চাহিদার সময় দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত থাকছে। অথচ ওই সময়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ফলে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহ ও যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এ অবস্থায় ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ চাপ দিয়ে চালাতে হচ্ছে। ফলে নতুন কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সম্মিলিত স্থাপিত সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার এসব কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৭ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বাড়ানোয় পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে কয়েক দিন কেন্দ্রটি সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। বৃহস্পতিবার থেকে রামপালে উৎপাদন বাড়ানো হয়।
তবে কয়লাভিত্তিক অন্য কয়েকটি কেন্দ্র এখনো পুরো সক্ষমতায় চলছে না। ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বৃহস্পতিবার গড়ে ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। প্রায় দুই মাস ধরে কেন্দ্রটির একটি যন্ত্রে সমস্যা রয়েছে।
একই ক্ষমতার আরএনপিএল পটুয়াখালী কেন্দ্র থেকে গড়ে উৎপাদন হয়েছে ৭১৫ মেগাওয়াট। সেখানে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট এবং ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কেন্দ্র থেকে বৃহস্পতিবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৭১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে সেখানে নিম্নমানের কয়লার সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে ৫৩টি সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিল্পকারখানায় কিছু অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে এখনো ফার্নেস অয়েল থেকে গড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করা হলেও তা সরকারের নির্ধারিত গড় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস ব্যবহার করতে পারে এমন ৫৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিটের মধ্যে অন্তত ২৬টি জ্বালানি সংকট, কম গ্যাসের চাপ কিংবা সরবরাহ সমস্যায় রয়েছে বলে সর্বশেষ উৎপাদন পরিস্থিতির তথ্যে উঠে এসেছে।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কোনো বড় কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কেন্দ্রগুলো দিয়ে ঘাটতি পূরণের স্বাভাবিক ব্যবস্থাও কার্যকর থাকছে না। এ কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক সোজা সাপটা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


বাড়ল লোডশেডিংয়ের চাপ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সোজাসাপটা রিপোর্ট
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে। এতে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে অন্য কেন্দ্রগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে লোডশেডিংয়ে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আদানির একটি ইউনিটের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। এর আগে আগস্টের শেষ দিক থেকে দিনের বেলায় আদানি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সময় প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।
পিডিবির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বয়লার ঠান্ডা হতে প্রায় দুই দিন সময় লাগবে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। সব ধরনের কাজ শেষ করে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রভাব বৃহস্পতিবার সারা দিনই বিদ্যুৎ সরবরাহে দেখা যায়। ওই দিন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। সে সময় সরবরাহ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ ওই সময় চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক থাকলেও এর পেছনে বড় কারণ ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়া। রাত ৯টার দিকে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৪ হাজার ৮৭৯ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৬ মেগাওয়াট।
পিডিবি সূত্র বলছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হতে পারে। কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যার কারণে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভারী জ্বালানি তেল বা ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে স্বাভাবিক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করা হচ্ছে।
চাহিদার সময় দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত থাকছে। অথচ ওই সময়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ফলে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহ ও যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এ অবস্থায় ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ চাপ দিয়ে চালাতে হচ্ছে। ফলে নতুন কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সম্মিলিত স্থাপিত সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার এসব কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৭ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বাড়ানোয় পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে কয়েক দিন কেন্দ্রটি সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। বৃহস্পতিবার থেকে রামপালে উৎপাদন বাড়ানো হয়।
তবে কয়লাভিত্তিক অন্য কয়েকটি কেন্দ্র এখনো পুরো সক্ষমতায় চলছে না। ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বৃহস্পতিবার গড়ে ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। প্রায় দুই মাস ধরে কেন্দ্রটির একটি যন্ত্রে সমস্যা রয়েছে।
একই ক্ষমতার আরএনপিএল পটুয়াখালী কেন্দ্র থেকে গড়ে উৎপাদন হয়েছে ৭১৫ মেগাওয়াট। সেখানে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট এবং ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কেন্দ্র থেকে বৃহস্পতিবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৭১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে সেখানে নিম্নমানের কয়লার সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে ৫৩টি সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিল্পকারখানায় কিছু অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে এখনো ফার্নেস অয়েল থেকে গড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করা হলেও তা সরকারের নির্ধারিত গড় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস ব্যবহার করতে পারে এমন ৫৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিটের মধ্যে অন্তত ২৬টি জ্বালানি সংকট, কম গ্যাসের চাপ কিংবা সরবরাহ সমস্যায় রয়েছে বলে সর্বশেষ উৎপাদন পরিস্থিতির তথ্যে উঠে এসেছে।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কোনো বড় কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কেন্দ্রগুলো দিয়ে ঘাটতি পূরণের স্বাভাবিক ব্যবস্থাও কার্যকর থাকছে না। এ কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ।


দৈনিক সোজা সাপটা

সম্পাদক :
আবু সাউদ মাসুদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
বাড়ল লোডশেডিংয়ের চাপ
0:00 / 0:00
1x