ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।  জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা-১ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রাশেদ মিজান স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ পরবর্তী এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন শুক্রবার বিকেল ৫টায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে (পূর্ব ব্লক, লেভেল-১) অনুষ্ঠিত হবে।সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ উপস্থিত থাকবেন এবং সার্বিক বিষয়ে কথা বলবেন।
সংবিধান অনুসারে, একজন রাষ্ট্রপতি স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে পারেন।
পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
কতদিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার নব্বই দিনের মধ্যে তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। নির্বাচনে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি-সংক্রান্ত সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন।’
রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কে সংবিধানের ৪৮ (৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি—(ক) পঁয়ত্রিশ বৎসরের কম বয়স্ক হন; অথবা (খ) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা (গ) কখনও এই সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ হতে অপসারিত হয়ে থাকেন।
সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে এবং রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুত করবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মেয়াদ নিয়ে ১২৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে ওই পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী নব্বই হতে ষাট দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; (২) মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার পর নব্বই দিনের মধ্যে, তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে নির্বাচন কমিশনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে। আইন অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। সেই প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন, সময় ও স্থান; মনোনয়নপত্র পরীক্ষার দিন; প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন; এবং ভোটগ্রহণের দিন ও সময় নির্ধারিত থাকবে।
তবে সংসদের অধিবেশন চলাকালীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত দিনের সাত দিন পূর্বে, স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়ে আইনের ৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রার্থী পদ প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত দিনে ও সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী কর্তার নিকট স্বাক্ষরযুক্ত নোটিশ দাখিল করে নিজের প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করতে পারবেন।
(২) যদি একজন ব্যতীত সব প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে থাকেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনার সেই একজনকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করবেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হওয়ায় সরকার মনে করছে, এক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তবে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন। এ বিষয়ে সরকারের কোনো করণীয় নেই।
চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে যাওয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত ফোনালাপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। 
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে তাকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে হবে। এরপর সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান করেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্বাচিত হন। পরে তিনি বিভিন্ন জেলায় জেলা জজের দায়িত্ব পালন শেষে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন।
পরে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকাকালে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পান। এরপর ওই পদ থেকে পদত্যাগ করে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হন সাহাবুদ্দিন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতির পট পরিবর্তন ঘটে। তখন জুলাই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি ওঠে। সে সময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রপতি পদে তার বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি।
আওয়ামী লীগের সময়ের রাষ্ট্রপতি হলেও সাহাবুদ্দিন বিগত জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, অভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ পড়ান। 
যদিও সেসময় তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি দেখা যায়। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিস থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ছবি সরিয়ে ফেলা হয়।
পরে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সাহাবুদ্দিন বিদেশি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই আচরণে ‘তিনি অপমানিত হয়েছেন’। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চলে যেতে চাই। এখান থেকে বেরিয়ে যেতেই আমি আগ্রহী।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে আবার রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রশ্নে রাজনীতিতে নানা আলোচনা তৈরি হয়। কিন্তু তখন কিন্তু তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছিলেন, এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়নি।

Link copied!