নারায়ণগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৮ জুলাই একটি রক্তাক্ত ও উত্তাল দিনের নাম। ২০২৪ সালের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ পরিণত হয়েছিল সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার নগরীতে। সকাল থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা রাত পেরিয়ে পরদিন ভোর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
সেদিন সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা চাষাঢ়ায় জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও যোগ দেন।
দুপুর ১২টার কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করলে মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টিয়ারগ্যাস ছোড়ার পর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আবারও সংগঠিত হয়ে সড়কে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি ছুড়লে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা খাজা সুপার মার্কেটের সামনে থাকা পুলিশের দুটি গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
এরপর পুরো চাষাঢ়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। অপরদিকে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিকেল পর্যন্ত চলে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় অংশ নেয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একই সময়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একটি বিশাল মিছিল ডিআইটি এলাকা থেকে চাষাঢ়ার দিকে অগ্রসর হলে তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষের জেরে সন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু শহরেই নয়, সংঘর্ষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। সাইনবোর্ড এলাকায় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপক গুলিবর্ষণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলার পর একপর্যায়ে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। জেলা পিবিআই কার্যালয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
শহরে দুপুরে শুরু হওয়া সংঘর্ষ রাত গভীর হলেও থামেনি। রাত ১০টার পর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থান থেকে সরে যেতে শুরু করে। এসময় নারায়ণগঞ্জের দুই নম্বর রেলগেট এলাকায় অবস্থিত পুলিশ বক্স, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
১৮ জুলাইয়ের সেই সহিংস দিন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। দিনটি শুধু সংঘর্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেও স্মরণ করা হয়। আজও সেই দিনের গুলির শব্দ, টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া এবং আতঙ্কের স্মৃতি বহন করে চলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আপনার মতামত লিখুন :