ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

উন্নয়ন বঞ্চনার নেপথ্যে কারা?

সাদনান আল নূর তিয়ান সাদনান আল নূর তিয়ান

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬

উন্নয়ন বঞ্চনার নেপথ্যে কারা?

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ফতুল্লা। সরকারের সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী পুরো কুতুবপুর ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাশীপুর, ফতুল্লা ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা আগের মতোই ইউনিয়ন পরিষদের অধীনেই থেকে যাচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই তিন ইউনিয়নের মাত্র দুই-একটি ওয়ার্ড সিটি করপোরেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ বিষয়ে চলতি মাসেই গণশুনানির কথা রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনো ফতুল্লার বিশাল জনগোষ্ঠীকে সিটি করপোরেশনের বাইরে রাখা হচ্ছে? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের প্রভাব?
স্থানীয় সচেতন মহল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিষয়টির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সবচেয়ে বড় অভিযোগটি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় অনেকের মতে, ফতুল্লার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নগুলো সিটি করপোরেশনের আওতায় চলে গেলে উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। ইউনিয়নভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ ও স্থানীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বড় একটি অংশ তখন সিটি করপোরেশনের হাতে চলে যাবে। ফলে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ও স্থানীয় ক্ষমতার হিসাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থা বহাল থাকলে চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যসহ অসংখ্য জনপ্রতিনিধির পদ বহাল থাকে। এসব পদকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একটি রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বলয় গড়ে ওঠে। ফলে অনেক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থী স্বাভাবিকভাবেই চান না ইউনিয়নগুলো সিটি করপোরেশনের আওতায় চলে যাক।
কারণ সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হলে ইউনিয়ন পরিষদ বিলুপ্ত হবে এবং চেয়ারম্যান-মেম্বারের পদও থাকবে না। পরিবর্তে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনের সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই অনেকে এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে। কাশীপুর, ফতুল্লা ও এনায়েতনগরের অধিকাংশ সচেতন বাসিন্দা মনে করেন, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
সিটি করপোরেশন সাধারণত নগর সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট লাইট, পরিচ্ছন্নতা, নগর পরিকল্পনা, পার্ক, ফুটপাত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, নগর অবকাঠামোসহ বহুমাত্রিক নাগরিক সেবা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক সক্ষমতা ও দায়িত্বের পরিধি তুলনামূলকভাবে অনেক সীমিত।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সিটি করপোরেশনের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট সাধারণত একটি ইউনিয়ন পরিষদের তুলনায় বহু গুণ বেশি হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকার, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগিতা এবং নিজস্ব রাজস্ব—সব মিলিয়ে সিটি করপোরেশন বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। বিপরীতে ইউনিয়ন পরিষদের আয় ও উন্নয়ন সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এখন ফতুল্লার জলাবদ্ধতা।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই ইসদাইর, গাবতলী, টাগারপাড়া, লালপুর, শিয়াচর, মাসদাইর, পাগলা, দাপা, কুতুবাইলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি পর্যন্ত তলিয়ে যায়। সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, স্কুল-কলেজে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই সমস্যা চললেও কোনো সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হয়নি। খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বড় আকারের ড্রেন নির্মাণ কিংবা পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ মূলত গ্রামীণ প্রশাসনিক কাঠামো। কিন্তু ফতুল্লা এখন কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ নগরাঞ্চল। এখানে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস, বহুতল ভবন এবং কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। অথচ প্রশাসনিক
কাঠামো এখনো গ্রামীণ ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে নগর সমস্যার সমাধান গ্রামীণ কাঠামো দিয়ে সম্ভব হচ্ছে না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, দ্রুত নগরায়িত এলাকায় সঠিক ড্রেনেজ পরিকল্পনা, সড়ক নেটওয়ার্ক, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি একক নগর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।
বর্তমানে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক এক সংস্থা, ড্রেন আরেক সংস্থা, পানি নিষ্কাশন অন্য সংস্থা এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা আরেক প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকায় সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। এর ফল ভোগ করছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল হয়েও ফতুল্লায় এখনো অনেক সড়ক অপরিকল্পিত, ফুটপাত নেই, পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট নেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল এবং বর্ষাকালে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাদের মতে, এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সে অনুপাতে অগ্রাধিকার পায়নি।
অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একই শহরের একাংশ সিটি করপোরেশনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করবে আর পাশের রাস্তার ওপারের মানুষ ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত সেবা পাবে এ ধরনের বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাদের মতে, প্রশাসনিক সীমানা বাস্তব নগরায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। নগরায়িত অঞ্চলকে গ্রামীণ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখলে পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এদিকে চলতি মাসে অনুষ্ঠিতব্য গণশুনানিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, শুনানিতে জনমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাশীপুর, ফতুল্লা ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফতুল্লার প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি সমান নাগরিক অধিকার, পরিকল্পিত নগরায়ন, উন্নয়ন বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য শহর গঠনের প্রশ্ন। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নগর পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

Link copied!