নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, ডাইং, টেক্সটাইল, ইস্পাত, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হয় এই জেলায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন এই শিল্পনগরীর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক কারখানার বয়লার ঠিকমতো জ্বলছে না। বিদ্যুতের লোডশেডিং ও ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে উৎপাদন লাইন বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের রপ্তানি খাতও।
ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ এলাকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা নির্ধারিত উৎপাদনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। কিছু কিছু কারখানায় রাতের শিফটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ফতুল্লার একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার একজন কর্মকর্তা বলেন, “গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক সময় বয়লার চালু রাখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বিদ্যুৎ গেলেই জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।”
শিল্প মালিকদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। অনেক ক্রেতা আবার নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে।
এদিকে জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে অনেক উদ্যোক্তা কারখানা নির্মাণ করেও উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জ্বালানি সংকট। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন করলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছেন না। ফলে নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু শিল্প খাতে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও পড়বে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, গত দুই বছরে দুই শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক উৎপাদন করছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি ও ইয়ুথ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দার বলেন, বর্তমান সরকার দীর্ঘদিনের একটি সংকটের উত্তরাধিকার পেয়েছে। তবে শিল্প খাতকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন না হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং নতুন বিনিয়োগও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে দেশের অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে।

আপনার মতামত লিখুন :