দৈনিক সোজা সাপটা

একসময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর ছিল আবাসিক এলাকার জন্য পরিচিত। কর্মজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ভাড়া বাসার জন্য

মাদক-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য মাসদাইর!



মাদক-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য মাসদাইর!
মাদক-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য মাসদাইর!

একসময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর ছিল আবাসিক এলাকার জন্য পরিচিত। কর্মজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ভাড়া বাসার জন্য জনপ্রিয় এই এলাকায় এখন দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং একের পর এক আলোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। এর প্রভাব পড়েছে বাসা ভাড়ার বাজারেও। স্থানীয়দের দাবি, নতুন ভাড়াটিয়ারা মাসদাইরে বাসা নিতে আগ্রহী নন, আর পুরনো অনেক ভাড়াটিয়াও নিরাপত্তার অভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
মাসদাইর বাজার এলাকার বাড়ির মালিক রহমত উল্লাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগে বাসা খালি হলে কয়েক দিনের মধ্যেই ভাড়া হয়ে যেত। এখন মাসের পর মাস খালি পড়ে থাকলেও কেউ দেখতে পর্যন্ত আসে না। যারা আসেন, এলাকার পরিস্থিতির কথা শুনে পরে আর যোগাযোগ করেন না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ আতঙ্কিত। অনেক পুরনো ভাড়াটিয়াও নিরাপদ পরিবেশের খোঁজে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বাড়ির মালিকরা।
শুধু রহমত উল্লাহ নন, মাসদাইরের আরও কয়েকজন বাড়ির মালিক একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মাসদাইর এখন অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাসদাইর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য মাদক স্পট, কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় রয়েছে। সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না। নিয়মিত চাঁদাবাজি, মারামারি ও অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগও রয়েছে।গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি মাদক মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় ইমন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, জাহিদ ও তার সহযোগীরাই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ওমর খৈয়াম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরিবারের অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর ৫ মে মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদক স্পটে অভিযান চালানোর আগে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় র‌্যাবের তিন সদস্য আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, জাহিদ বাহিনীর সদস্যরাই হামলায় জড়িত ছিলেন।
এরও আগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর পশ্চিম মাসদাইর বালুরমাঠ এলাকায় র‌্যাবের অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার নামে এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। আগের দিন কৃষক দল নেতা নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপরও হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটে।
সবশেষ ৭ জুলাই সন্ধ্যায় নিহত ইমনের বাবা ও হত্যা মামলার বাদী ওমর খৈয়ামের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনার কারণে মাসদাইর এখন টক অব দ্য টাউন এ পরিণত হয়েছে। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার পেছনে রয়েছে ভয়, অনিরাপত্তা ও অপরাধের বিস্তার।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, স্থায়ীভাবে মাদক স্পট উচ্ছেদ, সন্ত্রাসী চক্র ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মাসদাইরের আবাসিক পরিবেশ আরও সংকটের মুখে পড়বে এবং ভাড়াটিয়া সংকট বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন ) তারেক আল মেহেদী জানান, মাসদাইর এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। সন্ত্রাস, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক সোজা সাপটা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


মাদক-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য মাসদাইর!

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর ছিল আবাসিক এলাকার জন্য পরিচিত। কর্মজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ভাড়া বাসার জন্য জনপ্রিয় এই এলাকায় এখন দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং একের পর এক আলোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। এর প্রভাব পড়েছে বাসা ভাড়ার বাজারেও। স্থানীয়দের দাবি, নতুন ভাড়াটিয়ারা মাসদাইরে বাসা নিতে আগ্রহী নন, আর পুরনো অনেক ভাড়াটিয়াও নিরাপত্তার অভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
মাসদাইর বাজার এলাকার বাড়ির মালিক রহমত উল্লাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আগে বাসা খালি হলে কয়েক দিনের মধ্যেই ভাড়া হয়ে যেত। এখন মাসের পর মাস খালি পড়ে থাকলেও কেউ দেখতে পর্যন্ত আসে না। যারা আসেন, এলাকার পরিস্থিতির কথা শুনে পরে আর যোগাযোগ করেন না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ আতঙ্কিত। অনেক পুরনো ভাড়াটিয়াও নিরাপদ পরিবেশের খোঁজে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বাড়ির মালিকরা।
শুধু রহমত উল্লাহ নন, মাসদাইরের আরও কয়েকজন বাড়ির মালিক একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মাসদাইর এখন অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাসদাইর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য মাদক স্পট, কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় রয়েছে। সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না। নিয়মিত চাঁদাবাজি, মারামারি ও অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগও রয়েছে।গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি মাদক মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় ইমন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, জাহিদ ও তার সহযোগীরাই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ওমর খৈয়াম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরিবারের অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর ৫ মে মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদক স্পটে অভিযান চালানোর আগে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় র‌্যাবের তিন সদস্য আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, জাহিদ বাহিনীর সদস্যরাই হামলায় জড়িত ছিলেন।
এরও আগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর পশ্চিম মাসদাইর বালুরমাঠ এলাকায় র‌্যাবের অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার নামে এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। আগের দিন কৃষক দল নেতা নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপরও হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটে।
সবশেষ ৭ জুলাই সন্ধ্যায় নিহত ইমনের বাবা ও হত্যা মামলার বাদী ওমর খৈয়ামের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনার কারণে মাসদাইর এখন টক অব দ্য টাউন এ পরিণত হয়েছে। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার পেছনে রয়েছে ভয়, অনিরাপত্তা ও অপরাধের বিস্তার।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, স্থায়ীভাবে মাদক স্পট উচ্ছেদ, সন্ত্রাসী চক্র ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মাসদাইরের আবাসিক পরিবেশ আরও সংকটের মুখে পড়বে এবং ভাড়াটিয়া সংকট বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন ) তারেক আল মেহেদী জানান, মাসদাইর এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। সন্ত্রাস, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।


দৈনিক সোজা সাপটা

সম্পাদক :
আবু সাউদ মাসুদ

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
মাদক-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য মাসদাইর!
0:00 / 0:00
1x