জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনে প্রস্তাবিত এই বাজেট উত্থাপন করেন তিনি। এর আগে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়।
বাজেট বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা পেরিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আমি আজ এই মহান সংসদে আমাদের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের জন্য দাঁড়িয়েছি।
শুরুতেই বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের এবং নির্যাতিত নারীসহ সকল আত্মত্যাগী মানুষদের। একইসঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মদানকারী সকল শহিদ এবং গুম-খুন-হামলা-মামলা ও গুলিবর্ষণের শিকার সকল আহত যোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় জীবনে গণতন্ত্র, অধিকার ও নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
দেশ ও জনগণের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের শাসনের বিরুদ্ধেও এদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটিই ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের জমিন তৈরি করেছে। এই জমিনের ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হয়েছে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, মেরামত ও রূপান্তরের ৩১ দফার পথ ধরে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আরও সম্প্রসারিত প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে উপস্থাপন করেছে। আমরা যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করেছি সেটা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার ঘোষণাও ইতোমধ্যে তিনি জাতির সামনে দিয়েছেন।
অনেক আগে থেকেই বিএনপি এই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে এই কারণে যে ফ্যাসিবাদ দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন (ংড়পরড়-পঁষঃঁৎধষ ভধনৎরপ) যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়।
কিন্তু এটাও একই সাথে মনে রাখা দরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ (ঊপড়হড়সরপ উবসড়পৎধঃরংধঃরড়হ) অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনা সম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।
১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সকল প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবস্থার কেবল পুনরুদ্ধারই নয়, একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির ওপরে জনগণ যে ভরসা রেখেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সেই দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে আমরা জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে কেবলমাত্র সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ না, বরং আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট উপস্থাপন করছি। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন।
আগেই উল্লেখ করেছি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। ফলে একদিকে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে।
ফলে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকা শক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। আমরা সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছি। নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর জোর দিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলাম। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছি।
জনগণের গৌরবময় গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে তৈরি হওয়া নতুন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের এই অনন্য অভিযাত্রার শুরুতেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আমরা নতুন ও তীব্রতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।
আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ (উবসড়মৎধঢ়যরপ উরারফবহফ) ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ (খড়হমবারঃু উরারফবহফ)-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও (উবসড়পৎধঃরপ উরারফবহফ) অর্জন করবে।
সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে-
সবার জন্য উন্নয়ন: আমাদের লক্ষ্য সর্বজনের, সর্বশ্রেণীর, সর্বখাতের, সকল অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতা-নির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক (খরভব ঈুপষব ইধংবফ) সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে সকল বয়সের, সকল স্তরের নাগরিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।
বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বিনিয়ন্ত্রণকরণ (উবৎবমঁষধঃরড়হ) এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ: বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহ প্রদান।
জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: একটি অভিমুখমুখী, গতিশীল ও প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা।
প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি, নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা।
এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি (ঈৎবধঃরাব ঊপড়হড়সু), ক্রীড়া অর্থনীতি (ঝঢ়ড়ৎঃং ঊপড়হড়সু), সবুজ অর্থনীতি (এৎববহ ঊপড়হড়সু) এবং সুনীল অর্থনীতি (ইষঁব ঊপড়হড়সু)-এর মত খাতগুলোকে আমরা জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাই।
বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে আমরা নীতিগতভাবে প্রধান বিবেচনায় রাখছি, ভ্যালু ফর মানি (ঠধষঁব ভড়ৎ গড়হবু) অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (জবঃঁৎহ ড়হ ওহাবংঃসবহঃ) অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে নিয়োজিত হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; কর্মসংস্থান সৃষ্টি (ঔড়ন ঈৎবধঃরড়হ) অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা; পরিবেশগত বিবেচনা (ঊহারৎড়হসবহঃধষ ঈড়হংরফবৎধঃরড়হ) অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের ভিত রচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বাজেটে তার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকেই আমরা প্রতিফলিত করেছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ ও শোভন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতামূলক এবং সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের উন্নয়নের অভিযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের নীতি-পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনে প্রস্তাবিত এই বাজেট উত্থাপন করেন তিনি। এর আগে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়।
বাজেট বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা পেরিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আমি আজ এই মহান সংসদে আমাদের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের জন্য দাঁড়িয়েছি।
শুরুতেই বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের এবং নির্যাতিত নারীসহ সকল আত্মত্যাগী মানুষদের। একইসঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মদানকারী সকল শহিদ এবং গুম-খুন-হামলা-মামলা ও গুলিবর্ষণের শিকার সকল আহত যোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় জীবনে গণতন্ত্র, অধিকার ও নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
দেশ ও জনগণের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বরাবরই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের শাসনের বিরুদ্ধেও এদেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটিই ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের জমিন তৈরি করেছে। এই জমিনের ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হয়েছে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, মেরামত ও রূপান্তরের ৩১ দফার পথ ধরে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আরও সম্প্রসারিত প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে উপস্থাপন করেছে। আমরা যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করেছি সেটা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার ঘোষণাও ইতোমধ্যে তিনি জাতির সামনে দিয়েছেন।
অনেক আগে থেকেই বিএনপি এই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে এই কারণে যে ফ্যাসিবাদ দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন (ংড়পরড়-পঁষঃঁৎধষ ভধনৎরপ) যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়।
কিন্তু এটাও একই সাথে মনে রাখা দরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ (ঊপড়হড়সরপ উবসড়পৎধঃরংধঃরড়হ) অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনা সম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।
১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সকল প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবস্থার কেবল পুনরুদ্ধারই নয়, একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির ওপরে জনগণ যে ভরসা রেখেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সেই দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে আমরা জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে কেবলমাত্র সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ না, বরং আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট উপস্থাপন করছি। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন।
আগেই উল্লেখ করেছি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। ফলে একদিকে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে।
ফলে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকা শক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। আমরা সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছি। নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর জোর দিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলাম। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছি।
জনগণের গৌরবময় গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে তৈরি হওয়া নতুন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের এই অনন্য অভিযাত্রার শুরুতেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আমরা নতুন ও তীব্রতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।
আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ (উবসড়মৎধঢ়যরপ উরারফবহফ) ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ (খড়হমবারঃু উরারফবহফ)-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও (উবসড়পৎধঃরপ উরারফবহফ) অর্জন করবে।
সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে-
সবার জন্য উন্নয়ন: আমাদের লক্ষ্য সর্বজনের, সর্বশ্রেণীর, সর্বখাতের, সকল অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতা-নির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক (খরভব ঈুপষব ইধংবফ) সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে সকল বয়সের, সকল স্তরের নাগরিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।
বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বিনিয়ন্ত্রণকরণ (উবৎবমঁষধঃরড়হ) এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ: বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহ প্রদান।
জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: একটি অভিমুখমুখী, গতিশীল ও প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা।
প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি, নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা।
এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি (ঈৎবধঃরাব ঊপড়হড়সু), ক্রীড়া অর্থনীতি (ঝঢ়ড়ৎঃং ঊপড়হড়সু), সবুজ অর্থনীতি (এৎববহ ঊপড়হড়সু) এবং সুনীল অর্থনীতি (ইষঁব ঊপড়হড়সু)-এর মত খাতগুলোকে আমরা জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাই।
বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে আমরা নীতিগতভাবে প্রধান বিবেচনায় রাখছি, ভ্যালু ফর মানি (ঠধষঁব ভড়ৎ গড়হবু) অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (জবঃঁৎহ ড়হ ওহাবংঃসবহঃ) অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে নিয়োজিত হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; কর্মসংস্থান সৃষ্টি (ঔড়ন ঈৎবধঃরড়হ) অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা; পরিবেশগত বিবেচনা (ঊহারৎড়হসবহঃধষ ঈড়হংরফবৎধঃরড়হ) অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের ভিত রচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বাজেটে তার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকেই আমরা প্রতিফলিত করেছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ ও শোভন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতামূলক এবং সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের উন্নয়নের অভিযাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের নীতি-পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।

Safari-র নিচের Share (⬆) বাটনে চাপুন, তারপর "Add to Home Screen" বেছে নিন।
আপনার মতামত লিখুন