উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
আবু সাউদ মাসুদ, সম্পাদক ও প্রকাশক ||
একটি নির্বাচিত সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে সরকারের নির্দেশনা কতটা কার্যকর হচ্ছে, জনসেবা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে কিংবা বড় কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে কতটা গতি আসছে—এসবের পেছনে প্রশাসনের দক্ষতা ও সরকারের সঙ্গে তাদের সমন্বয় বড় বিষয়।বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে পুরোপুরি স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে সরকার প্রশাসনের সব স্তরের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না, অন্যদিকে কর্মকর্তাদের একটি অংশও রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ফলে কোথাও কোথাও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন উঠছে।সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রকে কাজে লাগানো। একই সঙ্গে প্রশাসনকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও তার সুফল পাওয়া কঠিন। এ কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।গত কয়েক বছরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আগের সরকারের সময় আমলাতন্ত্র ও পুলিশের একটি অংশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং কর্মকর্তাদের একটি অংশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজানোর প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রথম ছয় মাসে সেই পরিবর্তনের গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের ঘোষিত রাজনৈতিক সংস্কার ও প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে এখনও কিছুটা ফাঁক রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সরকারের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ প্রশাসনের ওপর আস্থা কমে গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি সংকুচিত হতে পারে। আবার প্রশাসনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ক্ষমতাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে বহাল রাখা হয়েছে।প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার কারণও রয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চুক্তিতে রাখা হলে নিচের সারিতে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যায়। ফলে যারা কয়েক বছরের মধ্যে সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা সমপর্যায়ের পদে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন, তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় এর প্রভাব পড়ছে।বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পর্যায়ের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।সরকারের পক্ষ থেকে এসব নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা গেলে প্রশাসনের ভেতরের অসন্তোষ অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি কিংবা দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা চলছে।সরকারের যুক্তি হতে পারে, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ও গতিশীল করতে অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রয়োজন। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা যথেষ্টভাবে তুলে ধরা না গেলে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে যদি ধারণা তৈরি হয় যে নিয়মিত প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তাহলে কর্মীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।সরকারের নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। তাই সচিবালয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি।সরকারের প্রথম ছয় মাসে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে একবার। তবে প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জেলা প্রশাসক সম্মেলনের বাইরে নিয়মিতভাবে মাঠ প্রশাসনের সমস্যা, স্থানীয় বাস্তবতা ও সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।বিদ্যুৎ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, খাদ্য সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না করলে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।সরকারের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে নতুন বেতন কাঠামো। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নতুন পে স্কেল নিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখন বর্তমান সরকারের জন্য বড় আর্থিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।সরকারের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ এবং অক্টোবর থেকে তা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পরিবর্তনের প্রত্যাশায় থাকা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিষয়টি ঝুলে থাকলে অসন্তোষ বাড়তে পারে। অর্থাৎ সরকার বাস্তবায়ন করলে আর্থিক চাপ বাড়বে, আর পিছিয়ে দিলে প্রশাসনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং জটিলতা বাড়তে পারে।আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল, প্রশাসনে যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে।কিন্তু ছয় মাস পরও সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার পুরোপুরি মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা এখনও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। আবার কেউ কেউ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন রাজনৈতিক সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনে পেশাদারিত্বের বদলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে।রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাইরে কিছু ব্যক্তি প্রশাসনিক বদলি, পদায়ন কিংবা পদোন্নতির বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন—এমন আলোচনা প্রশাসনের ভেতরে রয়েছে। এর ফলে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।রাজনৈতিক সরকারের জন্য এই ধরনের বলয় দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এরা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—দুই জায়গাতেই অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।সরকারের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—প্রশাসনকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রশাসনকে রাজনৈতিক দলের বিকল্প শক্তিতে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারই। আবার প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে উপেক্ষা করলেও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়।এ কারণে মেধা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা, প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে কর্মকর্তাদের নিয়মিত সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফাতেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং দলীয়করণমুক্ত কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। এখন সেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই দেখার বিষয়।সরকারের পথনকশা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে আস্থার ঘাটতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সরকারের ভালো উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে বাধার মুখে পড়তে পারে।তাই আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে—প্রশাসনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা নয়, বরং একটি পেশাদার প্রশাসনকে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা।