উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
আবু সাউদ মাসুদ, সম্পাদক ও প্রকাশক ||
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। একদিকে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়েও প্রভাব পড়ছে। একই সংকটের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহন চালকদের। সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চল থেকে আবাসিক এলাকা—দুই জায়গাতেই ভোগান্তি বাড়ছে।রূপগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত কয়েক লাখ শ্রমিকের জীবিকা সরাসরি শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের ওঠানামা ও লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।বিশেষ করে যেসব কারখানা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, সেখানে সংকটের প্রভাব পড়ছে দ্বিগুণভাবে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে উৎপাদন পুরোপুরি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে চলে যেতে পারেন। এতে শুধু কারখানা মালিক নয়, রপ্তানি আয় ও সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এ ওয়ান পোলার লিমিটেডের জোন এক্সিকিউটিভ মো. ইতমিনান বাছেদ প্রান্ত বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উৎপাদন কমে গেলে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে তারা অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছেন। এর প্রভাব দেশের রাজস্ব ও রপ্তানি আয়ের ওপরও পড়ছে।শিল্প মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারখানায় নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন না হওয়ায় অনেক শ্রমিককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।এদিকে গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। রূপগঞ্জের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে সকাল থেকে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না। কোনো কোনো স্টেশনে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ থাকায় চালকদের অন্য স্টেশনে ছুটতে হচ্ছে।রংধনু সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশনের ম্যানেজার আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে গ্যাসের চাপের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ ও একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকার কারণে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে তাদের কাছ থেকে জানা গেছে।গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে পরিবহন খাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। চালকদের সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাসের সংকটকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাড়ার অভিযোগও করছেন যাত্রীরা।শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপগঞ্জে শিল্পকারখানার বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং ও ভোল্টেজের ওঠানামা দেখা দেয়।তবে বিদ্যুৎ সংকট ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাশার আজাদ বলেন, আগের তুলনায় রূপগঞ্জে লোডশেডিং কমে বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। আড়াইহাজারের নতুন গ্রিড চালু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হরিপুর থেকে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে রূপগঞ্জের বিভিন্ন সাবস্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে সেই সরবরাহের একটি অংশ আড়াইহাজারেও যাচ্ছে। আড়াইহাজারে নতুন সাবস্টেশন চালু হলে সেখানে হরিপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, আগে রূপগঞ্জে লোডশেডিং ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। বর্তমানে তা কমে ৮ থেকে ১০ শতাংশে এসেছে। পরিস্থিতি আরও উন্নত করে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।শিল্প মালিকদের মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতির পাশাপাশি গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করাটাও জরুরি। কারণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই সংকট একসঙ্গে থাকলে কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানো সম্ভব হয় না।তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও।শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, মালিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, রূপগঞ্জের অর্থনীতিকে সচল রাখতে দ্রুত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা না গেলে এর প্রভাব শুধু রূপগঞ্জে সীমাবদ্ধ থাকবে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।