উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
Daily Soja Sapta, সম্পাদক ||
একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কীভাবে তাকে শনাক্ত করা হলো, দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে এবং এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য কী—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রেপ্তার কেবল একটি আইনি ঘটনা নয়; বরং এটি সরকারের অবস্থান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাদের ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সরকার আপসহীন অবস্থান নিয়েছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত কয়েক মাসে সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানবপাচার ও আর্থিক অপরাধ-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সেই ঘটনাও অনেকের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল আউয়াল ঠাকুর মনে করেন, সরকারের কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা নয়, বরং নীরব পদক্ষেপের মাধ্যমেই তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।তার ভাষায়, “যারা অতীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের বিষয়ে সরকার প্রকাশ্যে বেশি কিছু না বললেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও বেনজীর আহমেদের ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ।”নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলেন, বেনজীর ও মাসুদ উদ্দিনের মামলার ধরন আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে। দুজনই সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন এবং বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়েছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ সরকারের কঠোর অবস্থানকে প্রতিফলিত করছে।তিনি আরও বলেন, “ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের গ্রেপ্তারের ঘটনা আগে ঘটলেও বেনজীর আহমেদের মতো উচ্চপর্যায়ের একজন সাবেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন নজির খুব কম।”সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদলও মনে করেন, সরকার সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, “বিগত বছরগুলোতে যারা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি যে অবিচার হয়েছে তা জনগণের জানা। তাই অপরাধের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করাই স্বাভাবিক।”সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম, খুন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বেনজীরের নামও সেই তালিকায় আসে।অবসরের পরও তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করছিলেন। তবে ২০২৪ সালে তার বিপুল সম্পদ ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পর্বের অন্যতম আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও সম্প্রতি আইনের আওতায় আনা হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে তাকে সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।বর্তমানে তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানবপাচার ও মানি লন্ডারিংসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় সরকারের একটি স্পষ্ট বার্তা উঠে এসেছে—অপরাধের অভিযোগ থাকলে পদ, পরিচয় বা অবস্থান কাউকে দায়মুক্তি দিতে পারবে না।একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “দেশের ভেতরে হোক কিংবা বিদেশে, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বেনজীর আহমেদের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারা সরকারের সেই প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।”তাদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হলে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ে। একই সঙ্গে এটি একটি বার্তাও দেয়—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।